আলোচনা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
আলোচনা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ২৩ নভেম্বর, ২০০৮

সংস্কৃতি প্রত্যয়টি আমরা কি করে পেলাম

অনুঘটক পত্রিকার আর একটি উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ হলো আবুল কাসেম ফজলুল হক এর লেখা 'সংস্কৃতি আমাদের হারানো প্রত্যয়'। সংস্কৃতি কি, সংস্কৃতি বলতে কি বোঝায়, বাংলা ভাষায় সংস্কৃতি বিষয়ক অনুধাবন কবে থেকে কিভাবে শুরু হলো, সংস্কৃতি বলতে আমরা বর্তমানে কি বুঝছি, আর সংস্কৃতি বলতে সত্যিকারের কোন বিষয়টাকে বোঝায় ইত্যাদি বিষয়গুলোর আলোচনা রয়েছে এই প্রবন্ধটিতে।

জানা যায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মাধ্যমে বাংলাভাষায় সংস্কৃতি বিষয়ক ধারণার প্রথম প্রবর্তন ঘটে। ম্যাথু আর্নল্ডের (১৮২২-১৮৮৮) Culture and Anarchy বইটি পড়ে তিনি ইউরোপিয় কালচারের ধারণার সাথে পরিচিত হন। নতুন উপলব্ধিবোধে অনুপ্রাণিত বঙ্কিমচন্দ্র নিজেদের সংস্কৃতিবোধকে পুনর্গঠনের প্রেরণা অনুভব করেন। তাঁর আগে বাংলাভাষায় রচিত কোনকিছুতে সংস্কৃতি নিয়ে কারও ভাবনাচিন্তার কোন খোঁজ পাওয়া যায় নি। বঙ্কিমচন্দ্র ম্যাথু আর্নল্ডের পাশাপাশি বেন্থাম, স্টুয়ার্ট মিল, ডারউইন, স্পেন্সার, কোঁৎসহ বিভিন্ন ইউরোপিয় মনীষীর কাছ থেকে সাংস্কৃতিক চেতনার সাথে পরিচিত হয়েছিলেন। আবুল কাসেম বলেছেন:
তবে কালচার বিষয়ক ধারণার কোনো উপাদানই যে আগে বাংলা ভাষায় ছিল না, তা নয়। রামপ্রসাদের গানে আছে: 'এমন মানবজমিন রইল পতিত/ আবাদ করলে ফলত সোনা'। এখানে জীবনের যে আবাদের কথা বলা হয়ে তাকে কালচার বলা যায়। ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ, বানপ্রস্থ, সন্ন্যাস, সংযম, চিত্তশুদ্ধি, চিৎপ্রকর্ষ, সভ্যতা, সম্প্রীতি প্রেমধর্ম ইত্যাদি কথার মধ্যেও কালচারের ধারণা আছে।


উনিশ শতকের বাংলায় ইউরোপিয় দার্শনিকদের মধ্যে স্টুয়ার্ট মিল, অগাস্ট কোঁৎ ও চার্লস ডারউইনের প্রভাব সবচাইতে বেশি ছিল। বঙ্কিমচন্দ্র ম্যাথু আর্নল্ডের সুরে সুর মিলিয়ে বলেছেন: '"যে শিশু দেখিতেছে, ইহা মনুষ্যের অঙ্কুর। বিহিত কর্ষণে অর্থাৎ অনুশীলনে উহা প্রকৃত মনুষত্ব প্রাপ্ত হইবে।" বঙ্কিমচন্দ্র যখন সংস্কৃতি বিষয়টিকে অনুধাবন করার চেষ্টা করছিলেন, সে সময়ে বাংলাভাষায় আর কারও মধ্যে এ সম্পর্কিত কোনরূপ সচেতনতা লক্ষ্য করা যায় না। তাই বলা যায়, বাঙালিদের মধ্যে উনিশ শতকের শেষাংশর বঙ্কিমচন্দ্র থেকে সংস্কৃতি সম্পর্কে চিন্তার সূত্রপাত।
বঙ্কিম অনুভব করেছিলেন যে, কালচার ধর্মের মতোই একটি গুরুতর ব্যাপার, তবে ধর্ম থেকে ভিন্ন। ম্যাথু আর্নল্ড লিখেছেন: The substance of religion is culture. বঙ্কিমচন্দ্র এর অনুসরণে লিখেছেন : 'মানববৃত্তির উৎকর্ষণেই ধর্ম।' এর ষাট বছর পরে মোতাহার হোসেন চৌধুরী লিখেছেন: "ধর্ম সাধারণ লোকের কালচার, আর কালচার শিক্ষিত, মার্জিত লোকের ধর্ম।"........ অনুশীলন (রচনাবলীতে ধর্মতত্ত্ব) গ্রন্থে বঙ্কিচন্দ্র মানুষের মনুষ্যত্ব অর্জনের সমস্যা, সম্ভাবনা ও উপায় আলোচনা করেছেন। তবে তাঁর চিন্তা কেবল ব্যক্তিকে নিয়ে নয়, ব্যক্তির সঙ্গে সমাজকে নিয়েও। ব্যক্তি তাঁর দৃষ্টিতে সমাজের অংশ। মানুষের সৃষ্টি সামর্থ্য ও তার সদ্ব্যবহার নিয়েও তিনি চিন্তা করেছেন। নীতিবিজ্ঞানের বিচারে বঙ্কিম উপযোগবাদী বা পরিতৃপ্তিবাদী (Utilitarianist), আত্মনিগ্রহবাদী (Austerist) নন।
প্রথমদিকে ১৮৮৮ সালে ধর্মের ধারণার সঙ্গে কালচারের ধারণার মিশ্রণ ঘটিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র অনুশীলন নামে একটি বই লিখেছিলেন। পরে বঙ্কিম রচনাবলীতে এই বইটি 'ধর্মতত্ত্ব' নামে সঙ্কলিত হয়। আবুল কাশেম মনে করেন:
অনুশীলন বাংলা ভাষার এক অসাধারণ গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী গ্রন্থ। বাংলা ভাষার দেশে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এতে কেবল যে ব্যক্তিগত জীবনের কালচারের কথাই বলা হয়েছে, তা নয়; সামাজিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কালচারের কথাও এতে আছে। কালচার বা অনুশীলন ব্যাটারটা যে সৃষ্টিশীল, তাও বলা হয়েছে। এ গ্রন্থ আজকের দিনে বাংলাদেশের বাঙালিদের জন্য যেমন, পশ্চিম বাংলার বাঙালিদের জন্যও তেমনি- গুরুত্বপূর্ণ ও প্রেরণাদায়ক। আজো এ গ্রন্থ আমাদেরকে ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে জীবনজগত সম্পর্কে নতুন করে চিন্তা করতে প্রাণিত করে।
উনিশ শতকের শেষে এবং বিশ শতকের প্রথমদিকে অনুশীলন শব্দটাকে 'কালচার' শব্দের সমার্থশব্দ হিসেবে বহুলভাবে ব্যবহার করা হচ্ছিল। যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি 'কৃষ্টি' শব্দকে কালচারের সমার্থক হিসেবে প্রবর্তনের চেষ্টা চালান। ১৯২০ এর দশকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের সহায়তায় সংস্কৃতি শব্দটিকে প্রচার করেন। প্রমথনাথ বিশীও এই প্রচেষ্টার অন্যতম অংশীদার ছিলেন। সে সময়ে এই 'কালচার' শব্দের যথাযথ বাংলা শব্দ কি হতে পারে সে নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক হয়েছিল। 'কর্ষণ', 'চর্চা', 'শিক্ষা', 'বৈদগ্ধ্য', 'চরিত্র', ইত্যাদি শব্দকে প্রস্তাব করা হয়েছিল। এই শব্দগুলোর মধ্যে বিভিন্ন অর্থবোধক পার্থক্যর পাশাপাশি পরস্পরের মধ্যে মর্মগত ধারণারও বেশ পার্থক্য ছিল। পরবর্তীতে পাকিস্তান আমলে তমদ্দুন মজলিশ 'সংস্কৃতি' শব্দের পরিবর্তে 'তমদ্দুন' বা 'তাহজিব' শব্দদ্বয় প্রচলনের একটি প্রচেষ্টাও হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত টিকে গেছে সংস্কৃতি শব্দটি। তাহলেও কি হবে। প্রথমদিকে বঙ্কিচন্দ্র কালচার শব্দের মধ্যে যে বিশাল ধারণার সমাবেশ ঘটিয়েছিলেন কালক্রমে সে ধারণার বিলুপ্তি ঘটেছে। এখন সংস্কৃতি শব্দের ভাবার্থ আর ব্যাপক কোন ধারণাকে বহন করে না, বরং
অনেকাংশে সংকুচিত/ সঙ্কীর্ণ হয়ে গেছে।
ব্রিটেনে বেকন (১৫৬১-১৬২৬) থেকে, আমেরিকায় ইমার্সন (১৮০৩-১৮৮৩) থেকে এবং ইউরোপের অন্যান্য ভাষায় বেকনের কাছাকাছি সময় থেকে কালচারের ধারণার ধারাবাহিক বিকাশ লক্ষ্য করা যায়। বঙ্কিমের পরে ক্রমে ধারণাটি পৃথিবীর দক্ষিণাঞ্চলে বিস্তৃত হয়। বঙ্কিম থেকে পরবর্তী কালের বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ চিন্তকেরা প্রত্যেকেই কালচার বা সংস্কৃতি সম্পর্কে চিন্তা করেছেন। তবে বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ চিন্তকেরা কালচার বা সংস্কৃতির ধারণাকে যেভাবে বিকশিত করেছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রচারমাধ্যম ধারণাটিকে তা থেকে বিচ্যুত করে অর্থের দিক দিয়ে একেবারে সঙ্কীর্ণ করে ফেলেছে। আজকের প্রচারমাধ্যম সংস্কৃতি বলতে বোঝায় নাচগান, আবৃত্তি, নাটক ইত্যাদি বিনোদনমূলক বিষয়কে। সংস্কৃতি ও বিনোদন এখন সমার্থক হয়ে পড়েছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের বিদ্বৎসমাজও আজ ঔৎসুক্যহীন।
আমাদের দেশে সংস্কৃতি বিষয়ে যা হয়েছে তা পৃথিবীর ইতিহাসের বিপরীত পথে হেঁটেছে। পৃথিবীর অন্যান্য ভাষায় সংস্কৃতির ধারণাটি ক্রমশ বিকাশমান, কিন্তু আমাদের দেশে এই ধারণাটি ক্রমাগত সংকুচিত হয়ে চলেছে। বাংলা ভাষায় সংস্কৃতি নিয়ে বেশ কিছু অসাধারণ চিন্তাপ্রদায়ী গ্রন্থ রচনা হয়েছে। যেমন: 'অনুশীলন: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়', 'সংস্কৃতির রূপান্তর: গোপাল হালদার', 'কৃষ্টি কালচার সংস্কৃতি: নীহাররঞ্জন রায়' ইত্যাদি। সংস্কৃতি নিয়ে রবীন্দ্রনাথ, যোগেশচন্দ্র প্রমুখের ভাবনাগুলো রয়েছে তাদের বিভিন্ন প্রবন্ধে। এছাড়াও গত পঞ্চাশ বৎসরে আবুল মনসুর আহমদ, আবুল ফজল, আহমদ শরীফ, বদরুদ্দীন উমর, আব্দুল মতীন, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, যতীন সরকার এবং আরও অনেক প্রাজ্ঞ চিন্তক সংস্কৃতি নিয়ে তাদের ধারণা ও উপলব্ধি প্রকাশ করেছেন। পশ্চিম বাংলায় অন্নদাশঙ্কর রায়, নারায়ণ চৌধুরী, শিবনারায়ণ রায়, অম্লান দত্ত ও আরো অনেকে সংস্কৃতির স্বরূপ অন্বেষণে নিজস্ব মতামত প্রচার করেছেন। বস্তুত: গত সোয়াশো বৎসর ধরে বাংলাভাষার পণ্ডিতেরা সংস্কৃতিকে যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করার নিরন্তর প্রয়াস পেয়েছেন। আজকের দিনে সংস্কৃতিকে বুঝতে হবে এদের দেখিয়ে দেয়া পথ ধরেই। তাদের চিন্তার ধারাবাহিকতায় সংস্কৃতিকে অনুভব করতে হবে। এ প্রসঙ্গে লেখক বলেন:
সংস্কৃতির ধারণা সংস্কার এর ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। সংস্কার বলতে বোঝায় শুদ্ধিকরণ, পরিশোধন, সংশোধন, উৎকর্ষসাধন, উন্নতিবিধান, সৌন্দর্যবিধান ইত্যাদি। সংস্কৃতি মানে জীবন ও সমাজের শুদ্ধিকরণ, পরিশোধান, উৎকর্ষসাধন, উনইতবিধান, সৌন্দর্যবিধান। ইংরেজি Culture এর সম্পর্ক আছে Cultivation এর সঙ্গে। এই দুটি শব্দের অর্থও সংস্কৃতি আর সংস্কার এর অর্থের মত। জার্মান Culture শব্দও একই ধরণের অর্থ বহন করে। কৃষ্টি শব্দটিও একই অর্থের বাহক। কৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্ক আছে কৃষির বা চাষাবাদের।
এজন্য বলা হয় মানুষই সংস্কৃতির বাহক ও সাধক। শুধুমাত্র মানুষই পারে নিজের ও নিজের চারপাশের সংস্কার সাধন করতে। মানুষ ক্রমাগত তার পরিবেশের পরিবর্তন ঘটাতে চায়। চায় বিনির্মাণ করতে, পরিশীলিত করতে। তাই সাংস্কৃতিক অধিকার একমাত্র মানুষের রয়েছে, অন্য প্রাণীর নেই। মানুষ যতদিন পর্যন্ত বিবর্তনপ্রক্রিয়ার এক পর্যায়ে এসে নিজস্ব সাস্কৃতিক পরিচয় তৈরি করতে পারেনি, ততদিন পর্যন্ত অন্যপ্রাণীর সাথে তার পার্থক্য
ততোটা পরিলক্ষিত হত না। ব্যক্তিগত ও যৌথ প্রয়াস মানুষের জীবন ও পরিবেশের যে উৎকর্ষ সাধন করেছে, তার গতি নির্ধারিত হয়েছে মানুষের নিজের ইচ্ছায়। মানুষ যেভাবে নিজের জীবনকে তথা তার পরিবেশকে সমৃদ্ধ করতে চায় তাই তার সংস্কৃতি। ব্যক্তিগত আচরণ, জীবনযাত্রা, মনোভঙ্গি, আদর্শবোধ ইত্যাদির মধ্যে তার সাংস্কৃতিক উপলব্ধি ও প্রচেষ্টা নিহিত থাকে। শুধুমাত্র ব্যক্তিজীবন নয়, সাংস্কৃতিক চেতনা রয়েছে সামাজিক, জাতীয়, রাষ্ট্রীয় জীবনেও।
দর্শন, বিজ্ঞান ও শিল্পকলা সৃষ্টি মধ্য দিয়ে আর উন্নতিশীল রাষ্ট্রব্যবস্থা, সমাজব্যবস্থা ও জীবনপদ্ধতি প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে মানুষ তার সাংস্কৃতিক সামর্থ্যের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে।.... সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কে সম্পর্ক আছে রুচি, পছন্দ, দৃষ্টি, শ্রুতি, চিন্তাশক্তি, শ্রমশক্তি, সমাজবোধ, বিবেক-বুদ্ধি, আহার্য, ব্যবহার্য, পরিপার্শ্ব, আশা-আকাঙ্ক্ষা, বিচারক্ষমতা, গ্রহণ-বর্জন ও প্রয়াস-প্রচেষ্টার। সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে ব্যক্তির ও যূথের কর্মেন্দ্রিয়, জ্ঞানেন্দ্রিয়, আন্তরিন্দ্রিয় ও পরিবেশের সংস্কার, রূপান্তর ও নবজন্ম ঘটে। কোনো ব্যক্তির কিংবা জনগোষ্ঠীর উৎপাদনসামর্থ্য, সৃষ্টির সামর্থ্য, ন্যায়নিষ্ঠা, কল্যাণচেতনা, সত্যপ্রিয়তা, সৌন্দর্যবুদ্ধি এবং উন্নত ভবিষ্যত সৃষ্টির চিন্তা ও চেষ্টা ইত্যাদির মধ্য দিয়ে সেই ব্যক্তির কিংবা জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে।
কিন্তু আমরা যারা সাধারণ মানুষ তাদের একটি সহজ প্রবণতা হল সংস্কৃতির সংজ্ঞার সংকোচন ঘটানো। আমরা ব্যক্তিজীবনের চিন্তা-ভাবনা, আদর্শ, রুচি, দর্শনগত কোন পরিশীলন না করেই শুধুমাত্র গান-বাজনা অর্থাৎ বিনোদনচর্চাকে সংস্কৃতির
পরাকাষ্ঠা বলে গণ্য করি। আমরা মনে করি দুলাইন সঙ্গীত পরিবেশন করতে পারা বা নাটকে অভিনয় অর্থাৎ মঞ্চে নিজেকে প্রদর্শন করতে পারলেই সংস্কৃতির পরাকাষ্ঠা প্রকাশ করা হলো। এ সম্পর্কে স্পষ্ট ভাষায় আবুল কাশেম ফজলুল হক বলেছেন:
কেবল নাচ, গান, আবৃত্তি, নাটক, বিনোদন ইত্যাদিকেই সংস্কৃতি মনে করা ভুল। মানুষের সকল চিন্তা ও কর্ম এবং উৎপাদন ও সৃষ্টিই তার সংস্কৃতির বাহন। নাচ, গান, আবৃত্তি ও নাটকও সংস্কৃতির অন্যতম বাহন মাত্র, সংস্কৃতি নয়। সঙ্গীতানুষ্ঠান, নাট্যানুষ্ঠান, নৃত্যানুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক উৎসব (Cultural festival), সাংস্কৃতিক দল (Cultural troop) ইত্যাদি কথার মধ্য দিয়ে সংস্কৃতির যে রূপ পকাশ পায় তা অনুভূতি-নির্ভর ভাসাভাসা আংশিক রূপ মাত্র- সমগ্র রূপ নয়। নাচ-গান ও শিল্প সাহিত্যের মধ্য দিয়ে যেমন, তেমনি দর্শন-বিজ্ঞান-ইতিহাস, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক চিন্তা ও চেষ্টা এবং ব্যক্তিগত-পারিবারিক-সামাজিক জীবনের সকল চিন্তাভাবনা ও কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়েই প্রকাশ পায় ব্যক্তির ও সমষ্টির সংস্কৃতি। আত্মশক্তিকে সংগঠিত কর, বিদেশের ও অতীতের জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে প্রকৃতির রহস্য উদঘাটন করে ইতিহাসের গতি নির্ধারণের চিন্তা ও চেষ্টা আর ন্যায়-অন্যায়, কল্যাণ-অকল্যাণ, কর্তব্য-অকর্তব্য ও সুন্দর-কুৎসিত ইত্যাদি বিচার করে ন্যায়, কল্যাণ, কর্তব্য ও সুন্দরকে অবলম্বন করে জীবন-যাপনের চিন্তা ও চেষ্টা ইত্যাদির মধ্যেই ব্যক্তির ও সমষ্টির সংস্কৃতিমানতা নিহিত থাকে। বলাই বাহুল্য, কোনো জাতির সংস্কৃতির অভিব্যক্তি ঘটে সেই জাতির কৃতি ও কীর্তির মধ্যেই।
একটি মাত্র প্রবন্ধে সংস্কৃতির সম্পূর্ণকে প্রকাশ করা সত্যিই কঠিন। সংস্কৃতির যথার্থ সংজ্ঞাকে কোন বর্ণনা দিয়ে নয়, অনুভূতি দিয়ে উপলব্ধি করতে হয়। কোন ব্যক্তিবিশেষের সংস্কৃতি যেমন তার সত্যিকার পরিচয়কে উদঘাটন করে, তেমনি জাতীয় সংস্কৃতি প্রকাশ করে জাতিগত মূল্যমানকে। আমরা জাতি হিসেবে কেমন তার পরিচয় লুকায়িত থাকে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিতে। বিদেশী সংস্কৃতি, দেশীয় সংস্কৃতি ইত্যাদি ধুয়া তুলে এর সমাধান সম্ভব নয়। নিজের পরিচয় কোথায় লুকিয়ে আছে, তা বুঝতে হবে নিজেকেই। আর সেই মাপে পরিশীলিত করতে হবে নিজেকে। এই আত্মপোলব্ধির অভাবে তৈরি হয় অন্তঃসারশূন্যতা। আলোচ্য প্রবন্ধে লেখক আবুল কাশেম ফজলুল হক সংস্কৃতির এই সামগ্রিক ধারণাটিকে সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করেছেন। দিগন্তের এক বিন্দুবৎ প্রতিবিম্ব ফুটিয়ে তুলেছেন।
বিস্তারিত পড়ুন....

বুধবার, ১৯ নভেম্বর, ২০০৮

জয়নুল আবেদিনের শিল্পাচার্য হয়ে ওঠা

আগের পোস্টটিতে আমরা অনুঘটক পত্রিকার সাথে আংশিক পরিচিত হয়েছিলাম। আজ এই পত্রিকার একটি ভালোলাগা প্রবন্ধের কথা বলতে চাই। বলছিলাম গুরু আমার অমর গুরু প্রবন্ধের কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের অধ্যাপক মতলুব আলী শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন কিভাবে শিল্পাচার্য হয়ে উঠলেন সে সম্পর্কে লিখেছেন। বাংলাদেশের চিত্রকলার ইতিহাসে জয়নুল আবেদীন ছিলেন একজন পথপ্রদর্শক। কিন্তু শুধুমাত্র পথপ্রদর্শন করেই তিনি দায়িত্বমুক্ত হননি। নিজের ঘাড়ে তুলে নিয়েছেন চিত্রকলা শিক্ষার ভার। দেশভাগের কিছুদিন পর জয়নুল আবেদীন তাঁর মাতৃভূমি বাংলাদেশে চলে আসেন। তিনি চিত্রকলার প্রতি সম্পূর্ণভাবে আত্মনিমগ্ন ছিলেন। তাই এই জগৎ ছেড়ে অন্য কিছু করার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারতেন না। ঢাকায় এসে তিনি কয়েকদিনের মধ্যে একটি আর্টকলেজ প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ নেন। মাত্র ১৮ জন শিক্ষার্থী নিয়ে শুরু করা সেই আর্ট কলেজ আজ মহীরূহতে পরিণত হয়েছে। তিনি কমনওয়েলথ বৃত্তি পেয়ে পঞ্চাশের দশকের শুরুতে ইংল্যাণ্ডে গিয়ে তিনি লন্ডনের স্লেড স্কুল অব আর্ট এর ছাত্রত্ব গ্রহণ করেন। ছাপা ছবি ও চিত্রশিল্পে উচ্চশিক্ষা অর্জন করেন। অবশ্য তার আগেই তিনি তার শিল্পসামর্থ্যের যথেষ্ঠ প্রমাণ রাখতে পেরেছিলেন। মতলুব আলী'র ভাষায়-
"পাশ্চাত্যে অবস্থানকালে এবং তৎপরবর্তীকলেও যখন তিনি স্বদেশে অবস্থান করছেন, এঁকেছেন এমন অনেক চিত্র যা একদিকে বিষয়-উপজীব্য ও রূপ-বৈশিষ্ট্যে স্বদেশানুগ হয়েও গড়ন-গঠন ও প্রকাশশৈলীতে পাশ্চাত্যের শিল্পাদর্শের অনুকূল অতি উন্নত মানসম্পন্ন সৃজনশিল্পের প্রমাণ। সেদিক থেকে এদেশের নিরীক্ষাধর্মী আধুনিক চিত্রশিল্প শাখারও তিনি পথ-প্রদর্শক; কারণ শুরুটা গুরু-আবেদিনের মাধ্যমে শুধু সম্পাদিত হয়েছিলো বললে ভুলই হবে, আসলে তাঁর ওই সমস্ত ছবি (যেমন 'পাইন্যার মা'), 'গুণটানা', 'রমণী-১', 'চিন্তা', 'স্নানশেষে', 'কলসী কাঁখে' ও 'কৃষক' প্রভৃতি একটা শক্তিসম্পন্ন শিল্পকর্মের স্ট্যান্ডার্ড উপস্থাপিত করেছিলো পরবর্তী প্রজন্মের চারুশিল্পকর্মীদের জন্য।....... জয়নুল আবেদীন চেয়েছিলেন মাতৃভূমিতে চারুশিল্পীদের অংশগ্রহণ ও কর্মশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে একটি উন্নত শিল্পীসমাজ গড়ে উঠুক। শিল্পীরা ছবি আঁকবে, শিল্পচর্চা করবে আর তার মাধ্যমেই এমন সুন্দর এক পরিবেশ তারা সৃষ্টি করবে যা এদেশের শিল্পকলা ও সংস্কৃতির বিকাশ-অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।"


আর্ট কলেজের শিক্ষক জয়নুল আবেদীন কিভাবে শিল্পাচার্য হয়ে উঠলেন তার কাহিনী মতলুব আলী স্পষ্ট ভাষায় প্রকাশ করেছেন তাঁর 'আমাদের জয়নুল' (১৯৮৫) গ্রন্থভুক্ত 'শিল্পী থেকে শিল্পাচার্য' অধ্যায়ে। একথা তিনি নিজেই প্রবন্ধের শুরুতে উল্লেখ করেছেন। বিস্তারিত উদ্ধৃত করছি:-
'একদিন আর্ট কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা ঠিক করলো যে, তারা তাদের প্রাণপ্রিয় শিক্ষক প্রতিষ্ঠাতা-অধ্যক্ষ জয়নুল আবেদিনের নামের মাধ্যমে সে বছরের বার্ষিক প্রদর্শনীর উদ্বোধন করবে। তাই করাও হলো- তার সম্মানে কয়েকটি ছত্র কবিতার মতো লিখে, তার শেষে "জয়নুল আবেদিনকে আমরা স্মরণ করছি এই শুভ উদ্বোধনে" এই কথাগুলি প্রদর্শনী উপলক্ষে প্রকাশিত ছোট্ট পুস্তিকার প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপিয়ে দর্শকদের বিতরণ করে তারা প্রদর্শনীর দরজা খুলে দিলো। আর ওই লেখাটায় তাঁর নামের সামনে ছাত্ররা বুদ্ধি করে জুড়ে দিয়েছে নতুন একটি সম্মানজনক শব্দ: "শিল্পাচার্য"। তা অতিথি-দর্শকদের উদ্দেশে মাইকেও ঘোষণা করা হলো। 'আচার্য' অর্থ হচ্ছে শিক্ষক বা শিক্ষার গুরু, 'শিল্প' শব্দের সাথে আচার্য যোগ করে হলো 'শিল্পাচার্য'। আর জয়নুলতো শিল্প-শিক্ষা বা ছবি আঁকা শিক্ষার গুরুই। এখন 'শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন' এই নাম ছড়িয়ে পড়লো মুখে মুখে, ছাপানো হলো পত্র-পত্রিকায়। শেষটায় এমন হলো যে, শিল্পাচার্য বলতেই আমরা বুঝলাম জয়নুলের নাম।'
কিন্তু জয়নুল আবেদীনকে এত শুধুমাত্র ছাতদের দ্বারা সম্মানিত করার প্রয়োজন পড়লো কেন? স্বাভাবিক চিন্তায় এরূপ ভাবনা আসতেই পারে। তার উত্তরও রয়েছে আলোচ্য প্রবন্ধটিতে। মতলুব আলীর ভাষায়:-
বর্তমান নিবন্ধকারের জয়নুল-জীবনী বিষয়ক 'আমাদের জয়নুল' (১৯৮৫) গ্রন্থভুক্ত 'শিল্পী থেকে শিল্পাচার্য' অধ্যায়ের উদ্ধৃত কথাগুলি আমার এ-রচনার শিরোনামের সাথে ঘনিষ্ঠ- সে কারণে হুবহু উপস্থাপন করা গেলো। জয়নুল আবেদিনের শিল্পী ও ব্যক্তি জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অথচ মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার ওই ঘটনাটি ঘটেছিলো ১৯৬৭ সালে ঠিক যে-সময় ঢাকার আর্ট কলেজ পরিচয়ে সুবিদিত সরকারি চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে দীর্ঘ ১৮/১৯ বছর শিক্ষকতায় নিবেদিত থেকে ও প্রতিষ্ঠাতা-অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে অনিবার্য পরিস্থিতিতে ক্ষোভ-অভিমানের বশবর্তী হয়ে তিনি তাঁর পিতার মতোই স্বেচ্ছায় সরকারি চাকুরি থেকে অবসর গ্রহণ করেছিলেন। নানাভাবে নানাদিক থেকে শত চেষ্টা ও অনুরোধ-আবেদন করেও তাঁকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি তাঁরই নেতৃত্বে ১৯৪৮-এ প্রতিষ্ঠিত ওই চারুশিল্প শিক্ষায়তনে। শেষে উপায়ান্তর না দেখে মহান গুরুর প্রতি যথাযথ মর্যাদা প্রদানের পরিকল্পনা নিয়ে চারুকলার তৎকালীন শিক্ষার্থীরা তাঁকে তাঁর অনুপস্থিতিতেই 'শিল্পাচার্য' উপাধিতে ভূষিত করেছিলো।

জয়নুল আবেদিনের শিল্পাচার্য হওয়ার ঘটনাটি অনুঘটক পত্রিকার প্রবন্ধের স্বল্প পরিসরে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয় নাই। তবে আন্দাজ করা যায়, কর্তৃপক্ষের সাথে নীতিগত বিষয়ে হয়তো কোন মতদ্বৈধতা হয়েছিলো। ঠিক কত তারিখে ছাত্ররা সেই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলো সেটা উল্লেখ থাকলে পারিপার্শ্বিক ঘটনাবলীর স্বরূপ বোঝা যেত।
বিস্তারিত পড়ুন....

বৃহস্পতিবার, ১৩ নভেম্বর, ২০০৮

অনুঘটক: এক যথার্থ সামাজিক অনুঘটক

অনুঘটক পত্রিকাটি পাঠ করলাম। ১ম বর্ষ ১ম সংখ্যা আগস্ট ২০০৮ শ্রাবণ ১৪১৫ সংখ্যা। বর্ণনা হিসেবে 'শিল্প-সাহিত্য সংস্কৃতি বিষয়ক পত্রিকা' বিশেষণ প্রয়োগ যে একেবারে যথার্থ হয়েছে, তা পত্রিকার আগাগোড়া পাঠ শেষে অনুভব করলাম।

বৈশ্বিক সংকটকে বিশ্লেষণ এবং তার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সমস্যাগুলির স্বরূপ উপলব্ধি যে ভিন্নমাত্রার আলোচনার বিষয় নয়, তা বুঝতে পত্রিকাটি সত্যিই অনুঘটকের কাজ করেছে। বহুজাতিক কোম্পানির বাণিজ্যক্ষুধা গ্রাস করতে চলেছে সারা পৃথিবীর শক্তিহীন জনগোষ্ঠীকে। বাংলাদেশও এদের সর্বব্যাপী থাবার নিচে বসে আছে। আমাদের দুর্বলতা, সীমাবদ্ধতা, সংকীর্ণতার সুযোগ তারা ব্যবহার করছে পুরোমাত্রায়। ফলে মানুষ থেকে যাচ্ছে নিরন্ন, হচ্ছে শোষিত। সম্পাদকীয়তে বিষয়টাকে সংক্ষেপে আলোচনা করা হয়েছে। প্রকাশক ও সম্পাদক সাবিনা আফজা হক কিছুটা দ্বীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেছেন -
গভীর এক সংকট চলছে বিশ্বজুড়ে। চেষ্টা চলছে গোটা পৃথিবীতে বহুজাতিক কোম্পানি ও তাদের দোসর শাসক সম্প্রদায়ের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার। গ্লোবালাইজেসন বা বিশ্বায়নের নামে দেশে দেশে আধিপত্যবাদী সম্প্রদায়ের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। আবার এর বিপরীতে নানা দেশে সচেতন মানুষের প্রতিবাদ সমাবেশও পরিচালিত হচ্ছে। আবার এর বিপরীতে নানা দেশে সচেতন মানুষের প্রতিবাদ সমাবেশও অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গড়ে উঠছে প্রতিরোধ। সংগ্রামী জনগণই পারে বর্তমান বিশ্ব-ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে নতুন এক বিশ্ব ব্যবস্থার প্রবর্তন করতে। আর জনগণের এই সংকটে, সংগ্রামে পাশে থাকার প্রত্যয় নিয়েই জন্ম অনুঘটকের।

মুনাফালোভী কোম্পানীগুলো বংলাদেশেও মুখোমুখি হয়েছে প্রতিবাদের। জনগণের প্রতিক্রিয়া দেশের বিভিন্ন জায়গাতে তাদের মুখোশ উন্মোচন করেছে। তেল-গ্যাস, কয়লাসহ সকল প্রাকৃতিক সম্পদের উপর আপামর জনগণের অধিকারের দাবী দীর্ঘদিনের। এদেশেও এটা গণবাদী। "অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের লেখায় জানা যায় কিভাবে অসম চুক্তির মাধ্যমে জনগণের সম্পদ বহুজাতিক কোম্পানীর কাছে ইজারা দেয়া হচ্ছে।" ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল অঞ্চলে অবস্থিত গারো পাহাড় ও তার পরিপার্শ্বের বনাঞ্চল দেশের মোট বনাঞ্চলের এক ক্ষুদ্র ভগ্নাংশে পরিণত হয়েছে। এই অবশেষটুকুর উপরেও নজর পড়েছে আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানীর। "লাউয়াছড়া বনে কর্পোরেট তেল-গ্যাস কোম্পানির ধ্বংসযজ্ঞে গ্যাস অনুসন্ধানের নামে কেবলমাত্র বনের প্রতিবেশ ও প্রাণবৈচিত্রেরই যে ক্ষতি হয়েছে তা নয়, লাউয়াছড়া বননির্ভর স্থানীয় খাসিয়া, ত্রিপুরী, চা-বাগানী ও প্রান্তিক বাঙালি জনগণের অস্থিত্বও হুমকির সম্মুখীন। পাভেল পার্থর লেখায় উঠে এসেছে সেই ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র।" সম্পাদক প্রতিবাদ করে বলেছেন:-
ঘোষিত হয়েছে "জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা ২০০৮।" সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিভাবে পশ্চাদপদ নারী সমাজের উন্নয়নের কোন দিক নির্দেশনাই নেই এ নীতিমালায়। তারপরেও ধর্মান্ধ মৌলবাদী গোষ্ঠীর লাঠি প্রদর্শনের কারণে এ নীতিমালাও এখন অন্ধকারে।
অনুঘটক পত্রিকার সম্পাদনা পর্ষদে আছেন-
  • শারমিন মৃধা
  • ডা. সারোয়ার জাহান
  • সারোয়ারী কামাল
  • সাহানা আজুবা হক
এঁদের সুচিন্তিত বিবেচনায় সূচিপত্রের যে রূপ তার সম্পূর্ণটুকু নিচে তুলে দিলাম।

প্রবন্ধ
* সমুদ্রসীমা, তেল-গ্যাস চুক্তি ও জনগণের স্বার্থ: আনু মুহাম্মাদ
* কর্পোরেট খুনখারাবি ও রক্তাক্ত লাউয়াছড়া: পাভেল পার্থ
* বাংলাদেশে পোস্ট মডার্ণ' বিপ্লবের উদাহরণ: শনির আখড়া: এম. এম. আকাশ
* হবিগঞ্জ জেলার চা শ্রমিকদের সরল জীবনচিত্র- ৭ হাত বাই ১৪ হাত ঘরে তিন পুরুষের বসবাস: জিয়াউল হক বাবলু
* পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি সমস্যা ও ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন: মঙ্গল কুমার চাকমা
* সংস্কৃতি আমাদের হারানো প্রত্যয়: আবুল কাশেম ফজলুল হক
* বাংলাদেশে চলচ্চিত্র শিল্প: গজ্‌নফর কবীর

গল্প
* শিবলী পাত্রিসিয়া: ফারুক হাসান

কবিতা
* মৈত্রী ট্রেন: রহমান হেনরী, রাজশ্রীরা হারিয়ে যাচ্ছে- বিশ্বায়নের ঝাঁঝালো বসন্তে: সরওয়ার জাহান
* এসো আজিকে এসো: প্রত্যয় জসীম, দৃশ্যের দৃশ্য: আশিক আকবর
* বর্ষা আকাশ নামায়: ইয়াসির আজিজ, আমি থাকি ঘোরে: শিহাব বাহাদুর
* আমার এ মৃত্যুকূপের: হিজল জোবায়ের, নিবেদিত কবিতা: নাজমা সুলতানা বেবী
* ভিন্ন ভাষার কবিতা- আমির বারাকা: ভাষান্তর তুহিন তৌহিদ

বিজ্ঞান
* বুদ্ধির উদবর্তন মূল্য ও প্রজাতির অস্তিত্ব: রুশো তাহের

চিন্তা
* অবসাদের অধ্যাস: শাহজাহান চাকলাদার
* সাম্প্রতিক কবিতা- পরিপ্রেক্ষেত বিবেচনা: আহমেদ ফিরোজ

স্মরণ
* গুরু আমার অমর গুরু: মতলুব আলী
* ভাবনায় সেলিম আল দীন:পীযূষ শিকদার

নারী
* রাষ্ট্র পরিচালনায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ অপরিহার্য: সাবিনা আফজা হক

পত্রিকাটিকে সম্পূর্ণ করে তুলতে সম্পাদক ও সম্পাদনা পর্ষদের সদস্যরা নিয়ত ক্লান্তিহীন চেষ্টা চালিয়েছেন একথা অকুন্ঠচিত্তে স্বীকার করছি। এই ধরণের বিষয়সমৃদ্ধ পত্রিকা বিক্রি হয় কম। সেকথা তাঁরা বিলক্ষণ জানতেন। সেকথা স্বীকার করেছেন সম্পাদকীয়তেও:- "নতুন বছরের বাজেট পাশ হয়ে গেছে আরেক দফা বেড়েছে তেল-গ্যাসসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম, নাভিশ্বাস অবস্থা সাধারণ মানুষের।" সামাজিক দায়বদ্ধতাকে সম্পাদকগণ এড়িয়ে যেতে চাননি। তাদের এই চেতনাকে সম্মান করি।

# সম্পাদকীয়তে আলোকচিত্রী চলমান এর ছবির কথা বলা হয়েছিল। মনে হয়েছিল একাধিক ছবি থাকবে। কিন্তু রয়েছে মাত্র একটি। খাদ্যসঙ্কটের কথা বলা সেই ছবিটি সবশেষ পাতায় (পৃ-৩২) এমনভাবে দেয়া হয়েছে যে চোখে পড়েনা। কোন হেডিং নেই। পরবর্তী সংখ্যায় এটা সংশোধন করা হবে বলে প্রত্যাশা করি।
বিস্তারিত পড়ুন....

বুধবার, ৮ অক্টোবর, ২০০৮

সৈয়দ মুজতবা আলীর পঞ্চতন্ত্র

সৈয়দ মুজতবা আলী রচিত 'পঞ্চতন্ত্র' বইটি পড়লাম। তাঁর সব কটা বই এখনও আমি যে পড়ে উঠতে পারি নি, সেকথা স্বীকার করতে বিব্রত বোধ করছি। তাঁর 'দেশেবিদেশে', 'চাচাকাহিনী' বইদুটোই শুধু পড়েছি। বিখ্যাত 'শবনম' উপন্যাসটি এখনও পড়তে পারিনি।

আসলে বই কেনার অভ্যাসটাই আমাদের মধ্যে এখনও তেমনভাবে গড়ে ওঠেনি। আবার সামর্থ্য থাকলেও বই কেনার আগ্রহ ও সদিচ্ছার অভাবটাও মাঝেমধ্যে প্রকট হয়ে ওঠে। সৈয়দ মুজতবা আলীর বিখ্যাত 'বইকেনা' প্রবন্ধটি অনেকেরই পড়া আছে। এই প্রবন্ধটির মূল বক্তব্যও কিন্তু বই পড়া ও বইকেনার অভ্যাসকে নিয়েই। এই বইকেনা প্রবন্ধটি তাঁর 'পঞ্চতন্ত্র' গ্রন্থের অন্তর্ভূক্ত। পঞ্চতন্ত্র বইয়ের বেশিরভাগ রচনা ত্রিশের দশকের সমসাময়িক ঘটনাবলী নিয়ে রচিত।

তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের ছাত্র ও শিক্ষক সৈয়দ মুজতবা আলীর ভাষাতত্ত্ব ও ধর্মতত্ত্বে পাণ্ডিত্য ছিল অসাধারণ। একাধিক বিদেশী ভাষা যেমন সংস্কৃত, হিন্দি, আরবি, ফারসি, উর্দু, মারাঠি, গুজরাটি, ইংরেজি, ফরাসি, ইতালিয়ান ও জার্মান ভাষায় তিনি দক্ষ ছিলেন। তাকে পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্মতত্ত্ব ও তার তুলনামূলক বিচারে এই উপমহাদেশের স্বল্পসংখ্যক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে অন্যতম বলা হয়।


তাঁর পঞ্চতন্ত্র গ্রন্থটি অনেকগুলো প্রবন্ধের একটি সংকলন। গ্রন্থের সূচনায় লেখকের বয়ানে জানা যায়:-
এই পুস্তিকার অধিকাংশ লেখা রবিবারের 'বসুমতী' ও সাপ্তাহিক 'দেশ' পত্রিকায় বেরোয়। অনুজপ্রতিম শ্রীমান কানাই সরকার ও সুসাহিত্যিক শ্রীযুক্ত মনোজ বসু কেন যে এগুলো পুস্তিকাকারে প্রকাশ করার জন্য আমাকে বাধ্য করলেন সে কথা সুহৃদয় পাঠকেরা বিবেচনা করে দেখবেন।
সৈয়দ মুজতবা আলী, নয়াদিল্লী, আষাঢ়, ১৩৫৯
পঞ্চতন্ত্র বইটির সূচিপত্র বেশ সমৃদ্ধ। সবগুলো রচনাকে দুইপর্বে সাজানো হয়েছে।
  • প্রথম পর্ব ও
  • দ্বিতীয় পর্ব
প্রথম পর্বে প্রবন্ধ রয়েছে মোট ৩৫টি আর দ্বিতীয় পর্বে রয়েছে ৩৪টি। সৈয়দ মুজতবা আলী তার পাণ্ডিত্যমিশ্রিত রসবোধের জন্য বিখ্যাত। তাঁর সে অসাধারণ সামর্থ্যের পরিচয় প্রতিটি প্রবন্ধেই রয়েছে। কয়েকটি প্রবন্ধ থেকে উল্লেখযোগ্য অংশ তুলে ধরছি।
বার্ট্রাণ্ড রাসেল বলেছেন- সংসারে জ্বালা-যন্ত্রণা এড়াবার প্রধান উপায় হচ্ছে, মনের ভিতর আপন ভুবন সৃষ্টি করে নেওয়া এবং বিপদকালে তার ভিতরে ডুব দেওয়া। যে যত বেশী ভুবন সৃষ্টি করতে পারে, ভবযন্ত্রণা এড়াবার ক্ষমতা তার বেশী হয়।- বই কেনা
কোনটা মহত্ত্বর? জ্ঞানার্জন নাকি ধনার্জন? এ বিষয়ক একটি সমস্যার সমাধান লেখক খুঁজে পেয়েছেন জনৈক আরব পণ্ডিতের লেখাতে।
পণ্ডিত লিখেছেন- 'ধনীরা বলে, পয়সা কামানো দুনিয়াতে সবচেয়ে কঠিন কর্ম কিন্তু জ্ঞানীরা বলেন, না, জ্ঞানার্জন সবচেয়ে শক্ত কাজ। এখন প্রশ্ন, কার দাবিটা ঠিক, ধনীর না জ্ঞানীর? আমি নিজে জ্ঞানে সন্ধানে ফিরি, কাজেই আমার পক্ষে নিরপেক্ষ হওয়া কঠিন। তবে একটা জিনিস আমি লক্ষ্য করেছি, সেইটে আমি বিচক্ষণ জ্ঞানের চক্ষু-গোচর করতে চাই। ধনীর মেহন্নতের ফল হল টাকা। সে ফল যদি কেউ জ্ঞানীর হাতে তুলে দেয়, তবে তিনি সেটা পরমানন্দে কাজে লাগান, এবং শুধু তাই নয়, অধিকাংশ সময়েই দেখা যায়, জ্ঞানীরা পয়সা পেলে খরচ করতে পারেন ধনীদের চেয়ে অনেক ভালো পথে, ঢের উত্তম পদ্ধতিতে। পক্ষান্তরে, জ্ঞানচর্চার ফল সঞ্চিত থাকে পুস্তকরাজিতে এবং সে ফল ধনীদের হাতে গায়ে পড়ে তুলে ধরলেও তারা তার ব্যবহার করতে জানে না।- বই পড়তে পারে না।'- বই কেনা
আরব পণ্ডিতের বক্তব্য শেষ হয়েছে এই বলে যে 'অতএব সপ্রমাণ হল জ্ঞানার্জন ধনার্জনের চেয়ে মহত্তর।'
মুজতবা আলী এই গল্পের উপসংহারে বলেছেন -"তাই প্রকৃত মানুষ জ্ঞানের বাহন পুস্তক যোগাড় করার জন্য অকাতরে অর্থ ব্যয় করে।'- বই কেনা
'আহারাদি' প্রবন্ধটিতে খাবারের আন্তর্জাতিক রূপ যে কত বৈচিত্র্যময় তার একটি মনোজ্ঞ বর্ণনা পাওয়া যায়। এখান থেকে কয়েকটা খাবারের দেশিবিদেশী নাম জেনে নেই।
  • আমাদের দেশের মাংশের ঝোল এবং প্যারিসের রেস্তোরাগুলোতে পরিবেশিত 'হাঙ্গেরিয়ান গুলাশ' এর মধ্যে মূলগত কোন পার্থক্য নেই।
  • 'ইতালিয়ান রিসেত্তো' মূলত ভারতীয় পোলাও মাংসের মতই।
আহারাদি প্রবন্ধ থেকে একটু বর্ণনা করি।
কাইরোতে (কায়রো) খেলেন মিশরী রান্না। চাক্তি চাক্তি মাংস খেতে দিল, মধ্যিখানে ছ্যাঁদা। দাঁতের তলায় ক্যাঁচ ক্যাঁচ করে বটে, কিন্তু সোওয়াদ খাসা। খাচ্ছেন আর ভাবছেন বস্তুটা কি, কিন্তু কোন হদিস পাচ্ছেন না। হঠাৎ মনে পড়ে যাবে, খেয়েছি বটে আমজাদিয়ায় এই রকম ধারা জিনিস- শিক কাবাব তার নাম। তবে মসলা দেবার বেলায় কঞ্জুসী করেছে বলে ঠিক শিক কাবাবের সুখটা পেলেন না।

একই রান্না বিভিন্ন দেশে গিয়ে কিছুটা পরিবর্তিত হয়ে ভিন্ন নাম গ্রহণ করেছে। মানুষের রুচি, অভ্যাস ছাড়াও রাজনৈতিক, সামাজিক ইত্যাদি প্রভাব এর অন্যতম কারণ। ইতিহাস পাঠ করতে গিয়ে এর সন্ধান মেলে। তুর্কি ও পাঠানরা যখন ভারত জয় করে, তখন ভারতের পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলের মানুষেরা নিরামিষভোজী ছিল। তুর্কিদের প্রভাবে তারা মাংস খাওয়ায় অভ্যস্ত হয়। তুর্কিরাও পূর্বে মাংসের সাথে মসলা মেশাতে জানতো না। ভারতীয়দের প্রভাবে তারাও মশলা খাওয়া শুরু করে। নিজেদের ঐতিহ্যবাহী রান্নার সাথে ভারতীয় মসলার মিশ্রণে যে অসাধারণ রান্নার আবিষ্কার হল, তারই নাম মোগলাই রান্না। মোগলাই রান্নার ঘ্রাণ আস্তে আস্তে সারা ভারতকে ছেয়ে ফেলেছে। এই তুর্কিরা পরে যখন বল্কান অঞ্চল জয় করে হাঙ্গেরি পার হয়ে ভিয়েনাতে গিয়ে হাজির হয়, তখন মোগলাই মাংসের ঝোল পরিবর্তিত হয়ে 'হাঙ্গেরিয়ান গুলাশ' নাম ধারণ করল। মিশর ও তুর্কিদের সঙ্গে যোগাযোগের ফলে ভেনিসের মানুষ 'মিনসটমীটের' পোলাও বা 'রিসোত্তো' বানাতে শিখে ফেলল। গ্রিস তুরস্কের অধিকারভুক্ত ছিল বলে গ্রিসের রান্নাতেও মশলার যথেষ্ঠ ব্যবহার রয়েছে।

ভোজনবিলাসী মানুষ ছিলেন মুজতবা আলী। খাদ্যরসিকদের প্রতি তার যে ভালোবাসা, তা থেকে তিনি মন্তব্য করেছেন:-
পৃথিবীতে দ্বিতীয় উচ্চাঙ্গের রান্না হয় প্যারিসে কিন্তু মশলা অতি কম, যদিও রান্না ইংরেজী রান্নার চেয়ে ঢের ঢের বেশী। এককালে তামাম ইয়োরোপে ফ্রান্সের নকল করত, তাই বল্কান গ্রীসেও প্যারিসী রান্না পাবেন। গ্রীস উভয় রান্নার সঙ্গমস্থল। বাকি জীবনটা যদি উত্তম আহারাদি করে কাটাতে চান, তবে আস্তানা গাড়ুন গ্রীসে (দেশটাও বেজায় সস্তা)। লাঞ্চ, ডিনার, সাপার খাবেন ফরাসী মোগলাই এবং ঘরোয়া গ্রীক কায়দায়।
নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোসকে নিয়ে তার লেখা নেতাজী প্রবন্ধ থেকে দুটো অংশ উদ্ধৃত করি। সেকালের অর্থাৎ ব্রিটিশ আমলে দেশ স্বাধীন করার লড়াইয়ে হিন্দু-মুসলিম সমস্যাটা বেশ প্রকট ছিল। পরস্পরের মধ্যে হিংসা বিদ্বেষ এত বেশি ছিল যে শেষ পর্যন্ত ধর্মের নামে একটি অখণ্ড দেশ একাধিক ভাগে ভাগ হয়ে গেল। বেশিরভাগ নেতাদের মধ্যেই কোন না কোন ধর্মের প্রতি সহানুভূতি ছিল বা তারা কোন একটি ধর্মাবলম্বী মানুষদের পক্ষে কথা বলতেন। সেই ধর্মের মানুষেরাই শুধু তাকে সমর্থন করত। এর মধ্যে ব্যতিক্রম ছিলেন নেতাজী সুভাষচন্দ্র।
একদিকে যেমন দেখতে পাই, সুভাষচন্দ্র 'আজাদ হিন্দ' নামটি অনায়াসে সর্বজনপ্রিয় করে তুললেন, অন্যদিকে দেখি, কৃতজ্ঞ মুসলমানেরা তাঁকে 'নেতাজী' নাম দিয়ে হৃদয়ে তুলে নিয়েছে- 'কাইদ-ই-আকবর' বা ঐ জাতীয় কোনো দুরূহ আরবী খেতাব তাঁকে দেবার প্রয়োজন তারা বোধ করে নি।
হিন্দি-উর্দু ভাষা নিয়ে সে সময়ের রাজনৈতিক নেতারা সবসময় বিচলিত ছিলেন। কিন্তু সুভাষচন্দ্রের সে জাতীয় কোন সমস্যা ছিল না। মুজতবা আলীর ভাষায়-
রাজনৈতিক অন্তর্দৃষ্টি যে মহাত্মার থাকে, দেশকে সত্যই যিনি প্রাণ-মন সর্বচৈতন্য সর্বানুভূতি দিয়ে ভালবাসেন, সাম্প্রদায়িক কলহের বহু উর্দ্ধে নির্দ্বন্দ্ব পুণ্যলোকে যিনি অহরহ বিরাজ করেন, যে মহাপুরুষ দেশের অখণ্ড সত্যরূপ ঋষির মত দর্শন করেছেন, বাক্যব্রহ্ম তাঁর ওষ্ঠাগ্রে বিরাজ করেন। তিনি যে ভাষা ব্যবহার করেন, সে-ভাষা সত্যের ভাষা, ন্যায়ের ভাষা, প্রেমের ভাষা। সে-ভাষা শুদ্ধ হিন্দী অপেক্ষাও বিশুদ্ধ হিন্দী, শুদ্ধ উর্দু অপেক্ষাও বিশুদ্ধ উর্দু। সে ভাষা তাঁর নিজস্ব ভাষা।
সুভাষচন্দ্র দেশের সমস্যাটিকে এমনভাবে সবার সামনে উপস্থাপন করতে পেরেছেন যে, সাম্প্রদায়িক তুচ্ছতাকে মানুষ মোটেও আমলে নেয়নি।
আমার মনে হয়, সুভাষচন্দ্র এমন এক বৃহত্তর জাজ্বল্যমান আদর্শ জনগণের সম্মুখে উপস্থিত করতে পেরেছিলেন, এবং তাঁর চেয়েও বড় কথা, এমন এক সর্বজনগ্রহণীয় বীরজনকাম্য পন্থা দেখাতে পেরেছিলেন যে, কি হিন্দু, কি মুসলমান, কি শিখ সকলেই সাম্প্রদায়িক স্বার্থের কথা সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে দেশের স্বাধীনতা-সংগ্রামে যোগদান করেছিলেন। আমি যেন চোখের সামনে দেখতে পাই, সুভাষচন্দ্র বলছেন, 'আগুন লেগেছে, চল আগুন নেভাই, এই আমার হাতে জল। তোমরাও জল নিয়ে এসো।' সুভাষচন্দ্র কিন্তু এ কথা বলছেন না, আগুন নেভাতে হলে হিন্দু-মুসলমানকে প্রথমে এক হতে হবে, তারপর আগুন নেভানো হবে।
সৈয়দ মুজতবা আলীর পঞ্চতন্ত্র বইটি প্রকাশ করেছে স্টুডেন্ট ওয়েজ। এর প্রিন্টার্স লাইনে প্রকাশকাল সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য নেই। অন্তত: প্রথম প্রকাশ কাল উল্লেখ করা উচিত ছিল। এখানে লেখা আছে 'এস.ওয়েজ দ্বিতীয় সংস্করণ বৈশাখ ১৪১৫ বঙ্গাব্দ'। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হল এস. ওয়েজের প্রথম সংস্করণ কত সালে হয়েছিল তা বইয়ের কোথাও খুঁজে পেলাম না।
বিস্তারিত পড়ুন....

বুধবার, ২ জুলাই, ২০০৮

আহমদ ছফা সম্পর্কে মফিদুল হক

গত ২৭ জুন ২০০৮ তারিখের সমকাল পত্রিকার কালের খেয়াতে আহমদ ছফা সম্পর্কে প্রখ্যাত প্রকাশ মফিদুল হক আলোচনা করেছেন। আহমদ ছফা সম্পর্কে আমরা কেন যেন তেমন কোন আলোচনা করি না। পত্রিকায় বা বিভিন্ন আলোচনা সভায় আহমদ ছফার নাম কম শোনা যায়। এটা এক দিক দিয়ে আবার ভাল। কারণ তাকে বেশি বেশি করে আলোচনা করলে হয়তো অনেক অবান্তর কথারও জন্ম হয়ে যেত। সেদিক থেকে তাকে নিয়ে কম আলোচনা হওয়াকে ভাল বলেছি।

কালের খেয়াতে প্রকাশিত মফিদুল হকের লেখাটি আহমদ ছফাকে নিয়ে তার ব্যক্তিগত অনুভূতি অভিজ্ঞতার ফসল। তিনি আহমদ ছফাকে যেমন দেখেছেন, যেভাবে সম্মান করেছেন, উপকৃত হয়েছেন; তার রাজনৈতিক, সামাজিক জীবনকে যতটা কাছ থেকে দেখেছেন, তার সংক্ষিপ্ত অথচ মনোজ্ঞ বর্ণনা তিনি করেছেন। আমাদের আহমদ ছফা চর্চাকে আরও শাণিত করবে লেখাটি এতে আমার কোন সন্দেহ নেই। আরও বেশি পাঠকের কাছে লেখাটি পৌঁছাক এ আমার আন্তরিক প্রত্যাশা।


ব্যতিক্রমের মধ্যে ব্যতিক্রমী
মফিদুল হক

আহমদ ছফা, তাঁর কাছের-দূরের, পরিচিত-অপরিচিত, শত্রু-মিত্র, ভক্ত কিংবা সমালোচক সবাই মানবেন, ছিলেন এক ব্যতিত্রক্রমী মানুষ। ইংরেজিতে এদের বলা হয় ম্যাভরিক, বাংলায় ঠিক যুৎসই শব্ধ খুঁজে পাওয়া যাবে না, হতে পারে এ ধরনের শক্ত চরিত্র নরম পলিমাটির দেশ বাংলায় সচরাচর খুঁজে পাওয়া যায় না, আর তাই এমন চরিত্র বোঝানোর মতো শব্দও হাতের কাছে সহজে মেলে না।
ইংরেজি-বাংলা অভিধানে ম্যাভরিকের শব্দার্থ নেই, রয়েছে অনেক শব্দ মিলিয়ে এর ব্যাখ্যা। কিন্তু এসব অন্তত এটা পরিষ্কার করে যে, আহমদ ছফা সচরাচর দেখা পাওয়া আর দশটা মানুষের মতো ছিলেন না, কিংবা তিনি বিরলপ্রজ আর সব বঙ্গপ্রতিভার মতোও ছিলেন না, তিনি সত্যিই একেবারে আলাদা, নিশ্চিতভাবেই ম্যাভরিক।

শুরুতেই কবুল করে নিতে চাই আমি তাঁর একজন অনুরাগী, যেমন তাঁর রচনার, তেমনি তাঁর জীবনাচারের, কিংবা আরেকটু পোশাকিভাবে বললে তাঁর জীবনচর্যার, অথচ আমার মন-মানসিকতার একেবারে বিপরীত মেরুর মানুষ তিনি। আমি মুখচোরা স্বভাবের, নিজেকে আড়ালে-আবডালে রাখতে পারলে স্বস্তি পাই, তিনি একান্ত মুখরা, সদা মুখরিতই বলা ভালো, নিজেকে প্রবলভাবে প্রকাশে তাঁর যে আপত্তি নেই কেবল তা নয়, বরং আগ্রহই সমধিক। কারো মুখের ওপর কিছু বলা আমাদের স্বভাববিরুদ্ধ, কিন্তু আহমদ ছফা অবলীলায় বলতে পারেন অপ্রিয় সত্য কথা। চিন্তা-চেতনাতেও তাঁর সঙ্গে বিরুদ্ধতাই বেশি খুঁজে পাই। বাংলাদেশের বাজারে ভারতীয় বইয়ের বিশাল ভিত্তি তাঁকে বিচলিত করেছিল, তিনি এর বিরুদ্ধে নানা প্রতিবাদ সংগঠিত করেছেন, বাজারি সাহিত্যের কঠোর বিরুদ্ধাচারণ করেছেন, আর আহমদ ছফার যা স্বভাব, লেখালেখিতে কখনো তিনি গণ্ডিবদ্ধ থাকেননি, সভা-সমাবেশ করেছেন, প্ল্যাকার্ড হাতে মিছিল করেছেন, প্রাণভরে গালমন্দ করেছেন যারা এ বিরোধিতায় শরিক হতে অসম্মত তাদের। আমার ক্ষুদ্র বিবেচনায় শিল্প-সাহিত্যের বলয়ে এমনি বিভাজনরেখা শেষ বিচারে চেতনায় এক ধরনের সীমাবদ্ধতা বা ঘেরাটোপ আরোপ করে, যা কোনো জাতির পক্ষে আত্মনিধনের শামিল। আহমদ ছফার সঙ্গে এ প্রশ্ন ছাড়াও আরো অনেক বিষয়ে মিল খুঁজে পাই না, কিন্তু বলতে তো একটুও দ্বিধা থাকে না তিনি আমার বিশেষ সম্মানীয়জনের একজন, আমাদের কালের এমন এক ব্যতিক্রমী প্রতিভা যে মানুষটি চারপাশের সব নেতিবাচকতার বিরুদ্ধে প্রায় যেন একক প্রতিরোধে নেমেছিলেন এবং পরিপূর্ণভাবে এ সংগ্রামে ঝাঁপ দিয়েছিলেন, আর সেটা এতই পরিপূর্ণ ছিল যে চারপাশের বাস্তবতা থেকে গভীর মর্মবেদনা তাঁর ভেতরে জন্ম নিয়েছিল, তীব্র ও তিক্ত অনুভূতি এবং সে কারণেই তাঁর লেখা ও কথা হয়ে উঠেছিল বিষবাণ, অথচ তিনি নিজেই যে বিষের যন্ত্রণায় জর্জরিত হয়ে ছটফট করছেন, সেটা থেকে গেছে আমাদের নজরের বাইরে।
জোনাথন সুইফট এবং এডগার অ্যালান পো সম্পর্কে বলা হয়, লেখকেরা সবাই যখন জীবনকে বরণ করেন, সেই স্রোতের বিপরীতে এই দু’জন যেন মানবপ্রজাতির সদস্য হওয়াটাকেই প্রত্যাখ্যান করতে চেয়েছেন, তাঁদের মধ্যে ছিল জীবন সম্পর্কে তীব্র তিক্ত বিবমিষা। এমন কথা বাংলা সাহিত্যে খুব বেশি লেখক সম্পর্কে উচ্চারণ করা যাবে না, চারপাশের জীবনে যা প্রত্যক্ষ করেছেন কিংবা নিজের ব্যক্তিজীবনে যে ধরনের চরম বঞ্চনা ও নিষ্ঠুর অভিজ্ঞতার শরিক হয়েছেন তা একজন সংবেদনশীল শিল্পীসত্তার অধিকারীকে এমন অবস্থানে পৌঁছে দিতে পারে। কিন্তু প্রত্যাখ্যানবাদী এ অবস্থানে শিল্পীসত্তা নিয়ে সংহত থাকাটা অত্যন্ত কঠিন সাধনার বিষয়। তেমনি সাধক একান্তই হাতে গোনা যায়, আহমদ ছফা ছিলেন সেই ঘরানার বিরল এক শিল্পী, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় যিনি ছিলেন নিবেদিত। এমন প্রত্যাখ্যানবাদী আমাদের সমাজে একেবারে যে নেই তা নয়, এঁদের অনেকে আপন বলয়ে স্থিতধী থাকেন, অনেকে নিজের জন্য আলাদা সামাজিক আচার ও জীবন গড়ে নিতে পারেন, যেমন করেছিলেন এসএম সুলতান এবং যাঁকে আপন সত্তার প্রতিপুরুষ হিসেবে পরমভাবে বরণ করে লোকসমাজের সামনে তুলে ধরেছিলেন আহমদ ছফা, মনে হয় যেন নিজ ভাবনার প্রতিরূপকেই বুঝি তিনি এভাবে হাজির করতে পেরেছিলেন আমাদের সামনে।
তবে প্রত্যাখ্যানবাদী শিল্পীসত্তা কিংবা জীবনের অবমাননায় ক্রুদ্ধ মানস বহন করার পাশাপাশি আহমদ ছফা আরেক প্রবল আকুতি বহন করেছেন, তিনি ছিলেন একান্তভাবে নির্মাণবাদী, জীবনকে অস্বীকার করলেও মানবসত্তার পরিপূর্ণতার বিকাশ ঘটানোর আকুতি তাঁর মধ্যে ছিল একইরকমভাবে সহজাত ও তীব্র। ফলে প্রত্যাখ্যানের পাশাপাশি বহু ধরনের সামাজিক ও মানবিক বিকাশের কাজে তিনি নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন। প্রত্যাখ্যানবাদী যদি আরো কারো কারো খোঁজ মেলে, একইসঙ্গে এমনভাবে সম্মিলিত সামাজিক বিকাশের উদ্গাতা আর বিশেষ কাউকে পাওয়া যাবে কি-না সন্দেহ। এ দিক দিয়ে আহমদ ছফা নামক মানুষটিকে বলা যায় ব্যতিত্রক্রমের মধ্যে ব্যতিত্রক্রমী।
আমরা জানি, আহমদ ছফা ছিলেন অকৃতদার, সংসারবিবাগী মানুষ, ভেসে বেড়ানো বোহেমিয়ানা ছিল তাঁর স্বভাবগত, কিন্তু তিনি যে তীব্রভাবে ছিলেন সংসারপ্রেমী স্থিতিসন্ধানী মানুষ, সেটাও তো এর পাশাপাশি স্মরণ করতে হয়। যিনি অপার ভালোবাসায় চারপাশের মানুষকে আঁকড়ে ধরতে চান, আবার কাছের মানুষের মধ্যে কোনোরকম মানবী দুর্বলতার পরিচয় পেয়ে তীব্র প্রত্যাখ্যানে জ্বলে ওঠেন, যে কারণে তাঁর দুর্নিবার আকর্ষণে বহুজন কাছে এসেছেন, আবার দূরেও সরে গেছেন। কিন্তু ব্যক্তিমানুষের হয়তো বদল ঘটেছে, একজন দূরে গেলেও নতুন করে আরো দশজনকে কাছে টেনেছেন আহমদ ছফা, তাই তাঁকে ঘিরে রাখা মানব-বলয়ে কখনো কোনো ক্ষয় ঘটেনি, বরং কালক্রমে তা অর্জন করেছে আরো ব্যাপ্তি ও সমৃদ্ধি। এটাও লক্ষণীয়, যতই বয়স হয়েছে আহমদ ছফার সমবয়সী বন্ধু-পরিজনের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে এবং তিনি ক্রমান্বয়ে ঝুঁকেছেন তরুণতরদের দিকে, শিশুদের দিকে এবং ক্রমান্বয়ে ফুল-পাখি-লতাগুল্মের দিকে, যার অনন্য পরিচয় বিধৃত হয়ে আছে তাঁর ‘পুষ্প, বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ’ গ্রন্থে।
আপাতদৃষ্টিতে গৃহবিবাগী আহমদ ছফা অন্তরে বহন করেছেন পরম স্নেহভাব ও ভালোবাসা। এই স্নেহ ও ভালোবাসার কারণে নিকটজনের কাছে তাঁর প্রত্যাশার মাত্রাও ছিল অশেষ। সেই প্রত্যাশা-পূরণে প্রায় কেউই সক্ষম হতে পারেনি, ফলে সবার সঙ্গে সবসময় পথচলা আহমদ ছফার কখনো হয়ে ওঠেনি। ব্যতিক্রম যে দু-একজন ছিল না তা নয়, এমনি এক অনন্য ব্যতিক্রম অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক, যিনি আহমদ ছফাকে নিবিড়ভাবে বুঝতে পেরেছিলেন এবং গভীর প্রীতির সম্পর্কে বাঁধতে পেরেছিলেন। আহমদ ছফা মুক্তবুদ্ধির যে চর্চায় আগ্রহী ছিলেন, যেভাবে জীবনকে জ্ঞানসাধনায় উজাড় করে দিতে চেয়েছিলেন সেই অনুভূতি অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাককে আলোড়িত করেছিল নিঃসন্দেহে এবং তিনি হয়ে উঠেছিলেন ছফার জন্য প্রশ্রয় ও উৎসাহদাতা। এমন নয় যে, আহমদ ছফার সব কাজ তিনি মেনে নিতে পারেন কিন্তু স্নেহসিক্ত হাসি দিয়ে তিনি তো ছফাকে উপভোগ করতে পারতেন, তাঁর সাহচর্যে আনন্দ পেতেন। উভয়ের সম্পর্ক আপাতদৃষ্টিতে কিছুটা গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক, কিন্তু অন্তঃসলিলা এক ভাববিনিময় সেখানে বহমান ছিল যা উভয়ের জন্য ছিল উপভোগ্য ও আলোকসঞ্চারী। বাংলাদেশের দুটি গ্রন্থ অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা সর্বদা অর্জন করেছে, তার একটি সরদার ফজলুল করিম প্রণিত ‘দর্শনকোষ’ এবং অপরটি আহমদ ছফা অনূদিত গ্যেটের ‘ফাউষ্ট’। এ দুই গ্রন্থেই বহুমাত্রিক তাৎপর্য খুঁজে পেয়েছিলেন অধ্যাপক মহোদয়, প্রথমত উভয় গ্রন্থই মানবের জ্ঞানসাধনার সঙ্গে বাঙালিকে বাংলাভাষায় পরিচিত করে তুলেছে, যেটা ছিল আবদুর রাজ্জাকের সবসময়ের অন্বিষ্ট, সেইসঙ্গে ভাষার দিগন্ত প্রসারে গ্রন্থদ্বয় বড় অবদান রেখেছে। মাতৃভাষার মাধ্যমে জ্ঞান-সাধনার বিকাশে সর্বজনের অধিকার কায়েমের স্বপ্ন বহন করছিলেন অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক এবং সেই স্বপ্নের প্রতীকী উদ্ভাসন তিনি দেখতে পেয়েছিলেন এই দুই গ্রন্থে।

অনাত্মীয়দের সঙ্গে আত্মীয়তা গড়তে আহমদ ছফা সদা ছিলেন উদগ্রীব, কত না পরিবারের তিনি আপনজন হয়ে থেকেছেন, কতজনকেই না নিজের আপনজন করে নিয়েছেন। নিজের বিশ্বাস ও ধ্যান-ধারণায় তিনি কঠোরভাবে সিদ্ধাচারী, কিন্তু বিপরীত চিন্তার মানুষদের আপন করে নিতে তাঁর মধ্যে কোনো দ্বিধা ছিল না। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার পঙক্তি ধার করে বলতে হয়, তাঁর অঙ্গভঙ্গি কেদার রায়ের হলেও অন্তরে এক স্নেহকাতর মানস তিনি বহন করেছেন যা বহিরঙ্গের সঙ্গে একেবারে বেমানান।
সারাজীবন ঠাঁই বদল করে চলেছেন আহমদ ছফা, কী পেশা কী আবাস কোনো কিছুতেই স্থিতি খুঁজে পাননি তিনি, অথচ তাঁর এমন কোনো উচ্চ বাসনা ছিল না। বিত্তকে তিনি কখনোই বিশেষ মূল্য দেননি, বিত্ত আহরণের নানারকম সুযোগ তাঁর জীবনে এসেছিল, কখনোই তিনি সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করেননি। লিবিয়ার দূতাবাসের ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন তিনি মুয়াম্মার গাদ্দাফির উচ্চকণ্ঠ সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতায় মুগ্ধ হয়ে। তেল-সম্পদের বদৌলতে হঠাৎ-ধনী আরব দেশগুলো তখন মুসলিম উম্মাহর মধ্যে অনুগতজন তৈরিতে দেদার টাকা ঢালছে, পর্দার আড়ালে চলছে আরো নানা খেলা। এ যোগাযোগ আহমদ ছফা নিজ চিন্তাদর্শনের অনুকূল হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন, সেই সুবাদে কিছু লোকের একটা হিল্লে করার ব্যবস্থাও করেছিলেন। তাঁর দিক থেকে এক্ষেত্রে আর কোনোরকম স্বার্থ জড়িত ছিল না, তবে বিষয়বুদ্ধি প্রখর হলে এবং চাইলে এমন যোগাযোগ জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু আহমদ ছফা, তাঁর জীবনের বহমানতা নিয়ে, এখানেও বেশিদিন স্থিত হননি। জার্মানদের বিশেষ মনোযোগ পেয়েছিলেন তিনি, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসাও, সেই সূত্রে ‘বাংলা-জার্মান সম্প্রীতি’র তিনি ছিলেন অলিখিত প্রধান। তাঁর একটি টেলিফোনেও সেখানে অনেক কাজ হয়, অনেকের অনেক ধরনের উপকার করতে এ যোগাযোগকে তিনি অকাতরে ব্যবহার করেছেন। আমিও অযাচিতভাবে তাঁর ভালোবাসায় বরিত হয়েছি এবং ফ্রাঙ্কফুর্টে বইমেলায় যোগ দিতে আমাকে সহায়তা জোগাতে নিজে আমার অফিসে এসে প্রস্তাব রেখে যান এবং তা কার্যকর হতে বিশেষ সময় লাগেনি। যুৎসই একটা এনজিও দাঁড় করাতে পারলে সুশীল সমাজের নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়া যায় এবং বাংলাদেশের শিক্ষিত নাগরিকজনের জন্য এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে! কিন্তু এ সম্প্রীতির বৃত্তেও আহমদ ছফা বেশিদিন বিচরণ করেননি, অকুণ্ঠচিত্তে সব ঠেলেঠুলে তিনি বের হয়ে এসেছেন তাঁর সেই আত্মভোলা জীবনপথে।
আপাতভাবে ভেসে বেড়ানো মনে হলেও আসলে আহমদ ছফা চেয়েছিলেন স্থিত হতে, জ্ঞানচর্চায় নিবেদিত থাকতে এবং সেই চর্চাকে জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে সমষ্টির কল্যাণে অবদান রাখতে। অ্যাকটিভিষ্ট মানুষ হিসেবে জ্ঞানের আলোকবর্তিকা হাতে চলবেন পথ, এই ছিল তাঁর আকাঙ্ক্ষা। তাঁর সমস্ত যোগ্যতা সত্ত্বেও এই আকাঙ্ক্ষাপূরণে কোনো সহায়ক ভূমিকা সমাজ পালন করেনি। আমাদের জ্ঞানচর্চার প্রতিষ্ঠানগুলো এতই বিধিবদ্ধ ও কূপমণ্ডুক হয়ে পড়েছে যে সেখানে আহমদ ছফার মতো ব্যক্তিদের সম্পূর্ণ অপাঙ্ক্তেয় হয়ে থাকতে হয়েছে, অপ্রাতিষ্ঠানিকতার কোনো স্বীকৃতি সেখানে কখনো জোটেনি।
আহমদ ছফার যৌবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি এতটা কাঠামোবদ্ধ ছিল না। আহমদ ছফা বিদ্যাচর্চার বলয়ের সদস্য, এই পরিচয় অনেক মূল্য বহন করত। আনুষ্ঠানিকভাবে একটা গবেষণা-বৃত্তি তিনি গ্রহণ করেছিলেন, তারপর বছরের পর বছর থেকেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ছাত্রাবাসে। তাঁর এ অবস্থান নিজের জন্য এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও নবীন শিক্ষকদের জন্য যে ফলপ্রসূ হয়েছে সেটা আমরা অনুমান করতে পারি। আহমদ ছফাও তাঁর এ বিদ্যাপীঠের জীবন উপভোগ করছিলেন এবং স্বাধীন-জ্ঞানচর্চায় নিবেদিত থাকতে অনুকূল পরিবেশ খুঁজে পেয়েছিলেন। কিন্তু ছফার জন্য সেই সুযোগও অস্বীকৃত হয়েছিল, তাঁর জ্ঞান সাধনার কোনো স্বীকৃতিও ছিল না।

আহমদ ছফার প্রতি সমাজ কোনো দায়িত্ব পালন করেনি, যদিও সমাজের প্রতি দায় মোচনে ছফা জীবন-উৎসর্গ করে গিয়েছিলেন। ব্যতিক্রমী সাধকদের সম্মান জানাতে হলে ধরাবাঁধা পথের বাইরে যেতে হয়, যেমন ঘটেছিল ভারতের সুবিখ্যাত জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় বা জেএনইউর প্রথম সমাবর্তনে অভিনেতা বলরাজ সাহনিকে বক্তৃতা দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানোর মধ্যে। এ সিদ্ধান্তের অনেক সমালোচনা হয়েছিল, কিন্তু বলরাজ সাহনির অসাধারণ সমাবর্তন ভাষণ সব সমালোচনা স্তব্ধ করে দিয়েছিল। প্রসঙ্গত মনে পড়ে মিশেল ফুকোর পেশাগত জীবনের এক অধ্যায়ের কথা। কলেজ দ্য ফ্রান্স-এ এক বছরের জন্য হিস্টরি অব ফিলসফিক্যাল থটসের চেয়ারে আসীন হয়েছিলেন মিশেল ফুকো। যাঁরা এই সম্মানে অধিষ্ঠিত হবেন তাদের এক বছর কোনো ক্লাস নিতে হবে না, বরং প্রত্যাশা করা হয় তাঁরা কোনো মৌলিক বিষয়ে জ্ঞানচর্চায় নিবিদ্ধ থাকবেন এবং এ গবেষণার বিষয় কয়েকটি সেমিনার আয়োজনের মধ্য দিয়ে তুলে ধরবেন। বছরে ২৬ ঘণ্টা সেমিনারে লেকচার দেওয়া ছাড়া সম্মানীয় চেয়ারে অধিষ্ঠিত বিদ্বৎজনের আর কোনো দায় নেই। কলেজ দ্য ফ্রান্সে আয়োজিত এমনি সেমিনারে যে-কেউ শ্রোতা হিসেবে অংশ নিতে পারেন, কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিকতার অবকাশ এখানে নেই। তো ১৯৭৬ সালে মিশেল ফুকো এমনি যে কয়েকটি বক্তৃতা প্রদান করেছিলেন অসাধারণ সেই ভাষ্য পরে গ্রন্থাকারে প্রকাশ পেয়েছে ‘সোসাইটি মাস্ট বি ডিফেন্ডেড’ শিরোনামে। স্বভাবতই মনে হবে, এমনি বক্তৃতাদানের জন্য আমাদের সমাজে আহমদ ছফা ছিলেন একান্ত যোগ্য ব্যক্তি, মৌলিক চিন্তার অধিকারী ছিলেন তিনি, তেমনি ছিলেন মানুষ হিসেবে মৌলিক।
তবে এসব মানুষকে আমরা চিনি না, আমাদের কাছে তাঁরা ম্যাভরিক, পোশাকি ভাষায় বলি ব্যতিক্রমী, আমাদের প্রচলিত মাপকাঠির বাইরের এমনি এক মানুষ ছিলেন আহমদ ছফা, তাঁদের জন্য সমাজের দিক থেকে প্রচলভাঙা ব্যবস্থা নেওয়া দরকার ছিল, কিন্তু সমাজ সে কথা কখনো ভাবতে পারেনি। এটা আমাদের দুর্ভাগ্য, আহমদ ছফার নয়।

বিস্তারিত পড়ুন....

রবিবার, ২৯ জুন, ২০০৮

বিশ্বায়ন সম্পর্কে কার্লোস ফুয়েন্তেস

গত ২৪ এপ্রিল ২০০৮ তারিখে সান দিয়েগোর ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার ম্যানডেভিল অডিটোরিয়ামে 'গ্লোবালাইজেশন: এ নিউ ডিল ফর এ নিউ এজ' বিষয়ে প্রখ্যাত মেক্সিকান লেখক কার্লোস ফুয়েন্তেস একটি বক্তৃতা দিয়েছে। বাংলাদেশের বিশিষ্ট প্রবন্ধকার ও লেখক রাজু আলাউদ্দিন সেই বক্তৃতা অনুষ্ঠানে সপরিবারে উপস্থিত ছিলেন। কার্লোস ফুয়েন্তেসকে তিনি তার সম্পাদিত 'মেহিকান মনীষা' বইটি উপহার দিয়েছেন। ফুয়েন্তেস এক বর্ণ বুঝতে পারবেন না, তারপরও তার সংগ্রহে একটি বাংলা বই রাজু আলাউদ্দিনএর সৌজন্যে থেকে গেল এটা বাঙালি হিসেবে আমার কাছে একটা আনন্দ ও গর্বের বিষয়।

রাজু আলাউদ্দিন এর 'বিশ্বায়ন সম্পর্কে কার্লোস ফুয়েন্তেস' শীর্ষক লেখাটি বস্তুত একটা ভ্রমণ কাহিনী। তবে রচনাশৈলীর গুণে তা নিছক ভ্রমণলগ হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সমকালীন সাহিত্য, ফুয়েন্তেসের সক্রিয় জীবন, রাজনীতি, ভ্রমণ বর্ণনা, সান দিয়েগো ইউনিভার্সিটির বর্ণনা প্রভৃতি বিষয়ে রাজু আলাউদ্দিনের সরস ও বিস্তারিত বর্ণনা একটি নিবন্ধ পাঠের অনুভূতি এনে দেয়। লেখাটি পাঠ করতে করতে মনে হল এর কিছু অংশ বারবার পড়ার মত। অংশটুকু নিচে পুন:প্রকাশ করলাম। রাজু আলাউদ্দিন এর লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে সমকাল এর ২৭ জুন ২০০৮ সংখ্যার কালের খেয়াতে।


বিশ্বায়ন সম্পর্কে কার্লোস ফুয়েন্তেস
রাজু আলাউদ্দিন

ফুয়েন্তেসের মতে, ‘বিশ্বায়ন’ ধারণাটি সাম্প্রতিককালের। ২০ শতকের সর্বশেষ ধারণা হিসেবে এর জন্ম হলেও এর বিস্তৃতি আজকের একুশ শতকে। বিশ্বায়ন আসলে কী? ফুয়েন্তেসের মতে, এটি ক্ষমতারই এক কাঠামো (Power System)। অর্থনৈতিকভাবে অনুন্নত দেশগুলোর জন্য এ বিশ্বায়ন নামক দানবীয় ধারণাটি হয়ে উঠতে পারে ঝুঁকিপূর্ণ, যদি তাকে অনুন্নত দেশের অর্থনীতি বিকাশের অনুকূলে গ্রহণ না করা হয়। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলছেন, মুক্তবাজার এবং প্রতিযোগিতাপ্রবণ করপোরেশনগুলো ছোট এবং মাঝারি আয়তনের শিল্প-কারখানাগুলোকে গিলে খেয়ে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান এবং বেতন সংকট তৈরি করবে। তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নে এক বাধা হয়ে দাঁড়াবে। আখেরে তা কেবল ধনী এবং গরিবের মধ্যে দূরত্বকে ক্রমেই প্রসারিত করবে। আর একথা তো আমরা সবাই জানি যে, বিশ্বায়নের ধারণাটি এসেছে উন্নত দেশগুলোর মাথা থেকে। তারা মানবজাতির মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ না করে যখন বিশ্বায়নের পক্ষে ওকালতি করে তখন সেটা করে নিতান্তই তাদের অর্থনৈতিক বিকাশকে এক দানবীয় রূপ দেওয়ার জন্যই। এর পেছনে আদৌ কোনো সদিচ্ছা আছে কি-না তা নিয়ে গভীর সন্দেহ পোষণ করা যেতে পারে, যদি আমরা ফুয়েন্তেসের দেওয়া এ তথ্যগুলো মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করি : উন্নয়নশীল দেশগুলোর মৌলিক শিক্ষা-চাহিদা পূরণের জন্য ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারই যথেষ্ট, অন্যদিকে কেবল আমেরিকাতেই সমপরিমাণ অর্থ ব্যয় হয় প্রসাধন সামগ্রীর পেছনে। এটা কী করে মেনে নেওয়া সম্ভব?

আজকের পৃথিবীতে, গরিব দেশগুলোর খাদ্য, স্বাস্থ্য এবং পানি সমস্যা সমাধানের জন্য তের বিলিয়ন মার্কিন ডলারই যথেষ্ট। অন্যদিকে কেবল ইউরোপে সমপরিমাণ অর্থ ব্যয় হয় আইসক্রিমের পেছনে। এও কি গ্রহণযোগ্য? ইউনেস্কোর সাবেক মহাপরিচালক ফেদেরিকো মাইয়র এবং বিশ্বব্যাংকের (সাবেক) পরিচালক জেমস উলফেনসনের পক্ষে ‘এটা মেনে নেওয়া অসম্ভব, যে পৃথিবী অস্ত্রের পেছনে বছরে আনুমানিক ৮০০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে পারে সে কি-না প্রতিটি শিশুকে স্কুলে শিক্ষাদানের জন্য প্রয়োজনীয় ছয় বিলিয়ন মার্কিন ডলার জোগাড় করতে পারে না।’ বিশ্বব্যাপী সামরিক খাতে ব্যয়ের মাত্র এক শতাংশ অর্থ দিয়ে পৃথিবীর প্রত্যেক শিশুকে ব্লাকবোর্ডের সামনে দাঁড় করানো সম্ভব।

তবে এও সত্য যে, উন্নত দেশগুলোর অপকর্মের খতিয়ান এবং পরিসংখ্যান হাজির করলেই আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বিশ্বায়নকে ইতিবাচক করতে হলে আমাদের করণীয় আছে অনেক কিছু। চ্যারিটি বিগিনস অ্যাট হোম। অর্থনৈতিকভাবে প্রান্তীয় অঞ্চলের দেশগুলোর যদি স্থানীয় সরকার, পাবলিক সেক্টর, প্রশাসন ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক পরিকল্পনা দুর্বল হয়ে পড়ে তাহলে বিশ্বায়ন কোনো সুফল বয়ে আনতে পারবে না। স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি এবং স্থিতিশীল অর্থনীতি বিশ্বায়নের নেতিবাচক প্রবণতাকে ইতিবাচক প্রবণতায় রূপান্তরিত করা সম্ভব।

বিল ক্লিনটনের বক্তৃতা থেকে একটি উদ্ধৃতি ফুয়েন্তেস জানিয়েছেন, ১৯৯৩ সালে ক্লিনটন যখন আমেরিকার রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণ করেন তখন বিশ্বব্যাপী ওয়েবসাইটের সংখ্যা ছিল মাত্র পঞ্চাশটি। আর আট বছর পর তিনি যখন ক্ষমতা ত্যাগ করেন ততদিনে ওয়েবসাইটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৫০ মিলিয়ন এবং তা ক্রমেই বাড়ছে দ্রুতগতিতে। অতএব প্রশ্ন হচ্ছে, নতুন নতুন প্রযুক্তি এবং কম্পিউটার কি অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে কোনোভাবে সাহায্য করতে পারবে? সরকার যদি এগুলোকে গণমুখী কর্মকাণ্ডে পরিচালিত করতে পারে তাহলে সম্ভব। মোটামুটি এই-ই ছিল বিশ্বায়ন সম্পর্কে ফুয়েন্তেসের বক্তৃতার সারসংক্ষেপ। বক্তৃতা শেষে শুরু হলো প্রশ্ন-উত্তরের পালা। দর্শক-শ্রোতাদের মধ্য থেকে উৎসাহী সাত-আটজন সাধারণ কিছু প্রশ্নবাণে আক্রান্ত করার চেষ্টা করেছিলেন ফুয়েন্তেসকে। বিপুল পাণ্ডিত্য আর প্রখর বুদ্ধিদীপ্ত উত্তর দিয়ে সেসব প্রশ্ন তিনি মোকাবেলা করেছেন সাবলীলতার সঙ্গে।

বিস্তারিত পড়ুন....

শিক্ষক : গুরু থেকে পেশাজীবী

২২ জুন ২০০৮ এর সমকাল পত্রিকায় শিক্ষকদের প্রাইভেট টিউশনি বিষয়ে কাজী ফারুক আহমেদ এর একটি প্রয়োজনীয় প্রবন্ধ পড়লাম। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে শিক্ষকতার মান, শিক্ষকদের সমস্যা, সমাধান ইত্যাদি বিষয়ে তাঁর জ্ঞানগর্ভ বিশ্লেষণ প্রবন্ধটিতে রয়েছে। আমার মনে হল লেখাটি বারবার পাঠ করার মতো একটি রচনা। তাই সমকাল পত্রিকার প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকারপূর্বক লেখাটি এখানে প্রকাশ করলাম।
শিক্ষক : গুরু থেকে পেশাজীবী

প্রাইভেট টিউশনি
কাজী ফারুক আহমেদ

শিক্ষকদের প্রাইভেট টিউশনি নিয়ে আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ধরে বিরূপ সমালোচনা চলে আসছে। বাংলাদেশে আজ পর্যন্ত যতগুলো শিক্ষা কমিশন হয়েছে, তার প্রায় প্রত্যেকটিতে একই ভাষায় এর বিরোধিতা করা হয়েছে। তারপরও সরকারি-বেসরকারি স্কুলল-কলেজের শিক্ষকদের প্রাইভেট টিউশনি বন্ধ হয়নি। এখানে বলে রাখা ভালো, অনেকেই শিক্ষকদের প্রাইভেট টিউশনি ও কোচিং সেন্টারে ছাত্র ভর্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর ছাত্রছাত্রীদের ‘গ্যারান্টি দিয়ে চুক্তিভিত্তিক’ ছকে বাঁধা পাঠদানকে এক করে দেখেন; যদিও এ দুয়ের মধ্যে মিল ও অমিল দুটিই আছে।

কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট ১৯৭৪-এ বলা হয় : ‘জীবন ধারণের প্রয়োজন মেটাবার জন্য শিক্ষকদের অনেককে প্রাইভেট টিউশনি করতে হয়। এর ফলে একটা দুষ্টচক্র গড়ে ওঠে এবং নিন্ম বেতনভুক মানুষকে স্বল্প কাজ, এমনকি অসদুপায় এবং পরিণামে জনগণের অশ্রদ্ধা প্রভৃতির দিকে পরিচালিত করে। বলাবাহুল্য, এ অবস্থায় শিক্ষকদের কাছে উন্নতমানের শিক্ষাদান প্রত্যাশা করা কঠিন। ফলে শিক্ষার মান অবনমিত হয় এবং সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থা জনচক্ষে হেয় হয়ে পড়ে।’


জাতীয় শিক্ষা কমিশন ২০০৩-এর প্রতিবেদনে আছে : ‘শিক্ষকদের কাছে সমাজের চাহিদা অনেক। তবে তাদের বেতনভাতাদি অন্যান্য পেশায় নিয়োজিত সমযোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের তুলনায় কম। সচ্ছল জীবনযাপনের তাগিদে অনেক শিক্ষক এখন নিজেদের দায়িত্বের প্রতি কম মনোযোগী হয়ে প্রাইভেট টিউশন এবং কোচিংয়ের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। অনেক অভিভাবক নিজেদের সন্তান-সন্ততির ভালো ফল লাভের উদ্দেশ্যে একাধিক গৃহশিক্ষক নিয়োজিত করছেন। এর ফলে হচ্ছে এই যে, শিক্ষা এখন পণ্যে পরিণত হয়েছে। ব্যক্তিগত পর্যায়ে হয়তো কোনো কোনো শিক্ষক, অভিভাবক ও ছাত্রছাত্রী এর দ্বারা উপকৃত হচ্ছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে... বিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে।’

এডুকেশন ওয়াচের ২০০৭-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে : ‘প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় সরকারি কোষাগার থেকে অর্থায়ন উল্পুয়নশীল দেশগুলোর তুলনায় কম। শিক্ষাক্ষেত্রে অর্থায়নের অপ্রতুলতা পূরণ হয় অভিভাবকদের অর্থে। প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে তা ৫৯ শতাংশ, আর মাধ্যমিক স্তরে ৭১ শতাংশ। গৃহশিক্ষকের পেছনে ব্যয় সর্বোচ্চ। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪৩ শতাংশ ছাত্রের এবং বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৮৫ শতাংশ ছাত্রছাত্রীর জন্য গৃহশিক্ষক রাখতে হয়েছে।’

আন্তর্জাতিক শ্রম আইন ও আইএলও বিধান মোতাবেক একজন শ্রমজীবী-পেশাজীবীর বেতনভাতা এমন হওয়া উচিত যাতে তাকে বাড়তি বা খণ্ডকালীন পেশা গ্রহণ করতে না হয়। বাংলাদেশে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিতদের বেলায় সরকারের নীতিতে যে এর প্রতিফলন নেই, তা আজ অত্যন্ত স্পষ্ট। বেতনভাতা, মানসম্মান কোনোটাই আকর্ষণীয় না হওয়ায় শিক্ষকদের পেশা ত্যাগ অথবা পেশা পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত সেজন্যই সবচেয়ে বেশি। প্রধানত, যেসব কারণে এবং বাস্তব পরিপ্রেক্ষিতে একজন শিক্ষার্থী প্রাইভেট টিউটরের কাছে পড়ে এবং অভিভাবকও সেজন্য অর্থ ব্যয় করেন, তা হলো : ১. শ্রেণীকক্ষে শিক্ষকদের পাঠদানকালে শিক্ষার্থীরা তার সঙ্গে তাল মেলাতে অপারগতা; ২. নির্দিষ্ট কোনো বিষয় বা সূচি শিক্ষার্থীর কাছে দুর্বোধ্য ও অবোধগম্য মনে হওয়া; ৩. শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতি; ৪. নির্ধারিত বিষয় বা পাঠ্যক্রমে আকর্ষণীয়ভাবে ও দক্ষতার সঙ্গে উপস্থাপনে শিক্ষকের অক্ষমতা; ৫. পরীক্ষা, বিশেষ করে পাবলিক পরীক্ষায় ভালো ফল লাভে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের অতি আগ্রহ।
আমাদের দেশে সব বিষয়ের শিক্ষকের প্রাইভেট টিউটর হিসেবে চাহিদা নেই। তাছাড়া শুধু সরকারি-বেসরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষকই প্রাইভেট পড়ান না। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাও পড়ার খরচ জোগাড় করতে প্রাইভেট টিউশনি করে থাকেন। আজকাল ছাত্রীদেরও বাসায় গিয়ে টিউশনি করতে দেখা যায়। বর্তমানে বেকারত্ব ঘোচাতে কম ঝামেলা ও ঝুঁকিমুক্ত প্রাইভেট টিউশনিকে কেউ কেউ পেশা হিসেবেও গ্রহণ করছেন। ঢাকা মহানগর ও বিভাগীয় শহর ছাড়া বেশ কিছু জেলা শহরেও কিছু কিছু বিষয়ে প্রাইভেট টিউটরের কদর আছে। ইংরেজি, অঙ্ক ও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে একচেটিয়া প্রাধান্য। প্রাইভেট টিউটরের কাছে পড়লে প্র্যাকটিক্যালে ভালো নম্বর পাওয়া যায়- এমন অভিযোগও বেশ পুরনো। কিন্তু বিশেষ করে ঢাকা মহানগরে একশ্রেণীর অভিভাবককে সন্তানদের পালা করে সব বিষয়ের প্রাইভেট টিউটরের কাছে পাঠাতে দেখা যায়। যাদের পয়সা বেশি, তারা বাড়িতেই প্রাইভেট টিউটরের ব্যবস্থা করতে চেষ্টা করেন। কিন্তু যেসব প্রাইভেট টিউটর বাসাবাড়িতে গিয়ে না পড়িয়ে নিজের বাসায় ব্যাচ খুলে প্রাইভেট পড়ান, অভিভাবকরা ছেলেমেয়েদের চাহিদা পূরণে সেখানেই ছুটে যান। প্রাইভেট টিউটরদের আয়-রোজগার বড় বড় শহরে ভালোই। প্রতিষ্ঠানে অর্থাৎ স্কুল-কলেজের বেতন থেকে কয়েকগুণ বেশি তো বটেই! গাজীপুরের কালিয়াকৈরের শিক্ষক সতীশ চন্দ্র সরকার বেসরকারি শিক্ষকদের টিউশনি নিয়ে ১৭ মার্চ দৈনিক সমকালে লিখেছেন : ‘প্রাইভেট টিউশনি শিক্ষকদের কর্মক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে- এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। আমি প্রায় ২০ বছর ধরে শিক্ষকতায় আছি। প্রতিদিন ৬টি বিষয়ে পাঠদান করি। বাসা ভাড়া দিই ৪ হাজার টাকা। বাচ্চা ছেলেটির জন্য গুঁড়ো দুধ কিনতে হয় মাসে ৩ হাজার টাকার। বেতনের ওপর নির্ভর করে কোনোভাবেই চলা সম্ভব নয়। কাজেই শখের বশে নয়, ধনী হওয়া বা উচ্চাশা নিয়েও নয়, শুধু বর্তমান প্রতিকূল পরিবেশে নিজেদের খাপ খাওয়ানোর জন্য প্রাইভেট টিউশনির দিকে ঝুঁকতে হয়। পার্শ্ববর্তী ভারতের পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রাইভেট টিউশনি নিষিদ্ধ। সেখানে প্রত্যেক শিক্ষক নিয়োগের সময় প্রাইভেট টিউশনি না করার অঙ্গীকারনামায় সই করে থাকেন। কারণ একটাই, পশ্চিমবঙ্গের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন ভারতীয় মুদ্রায় ন্যূনতম ১৫ হাজার টাকা।

পরিবার-পরিজন নিয়ে সম্মানজনকভাবে জীবনযাপনের একটা নিশ্চয়তা পেলে এ দেশেও শিক্ষকরা প্রাইভেট টিউশনি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন। আইন করে প্রজ্ঞাপন জারির মারফত একটা অসন্তুষ্টি আর অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে না।’

দেশ অথবা বিদেশ যেখানেই প্রচলিত থাকুক, শিক্ষকদের প্রাইভেট টিউশনি শিক্ষকতার মর্যাদার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ এবং অনাকাঙ্ক্ষিত। আমাদের দেশে তা শিক্ষাব্যবস্থা ও পরীক্ষাপদ্ধতির অন্তর্নিহিত বিচ্যুতির বহিঃপ্রকাশ। শিক্ষাকে মানব উন্নয়নের সোপান বিবেচনায় ও যুগোপযোগীকরণে ব্যর্থতা, অর্থ ও মানবসম্পদের বিশাল অপচয় এবং শিক্ষাদানে নিয়োজিতদের প্রতি উপেক্ষাসূচক দৃষ্টিভঙ্গির করুণ পরিণতি। দেশের স্বার্থেই এ অবস্থার আশু অবসান প্রয়োজন। শ্রেণীকক্ষে পাঠদান ও গ্রহণই যেখানে কাম্য, সেখানে অর্থের বিনিময়ে শিক্ষকের নিজ গৃহে পাঠদান অথবা বিত্তশালীর গৃহে গিয়ে ‘জ্ঞান বিতরণ’ কোনোটাই সমর্থনযোগ্য নয়।

প্রতিকারের লক্ষ্যে ৭টি প্রস্তাব : শিক্ষকের প্রাইভেট টিউশনি তথা শিক্ষাক্ষেত্রে বর্তমান নৈরাজ্যের একটি বিশেষ দিকের অবসানকল্পে জরুরিভাবে নিম্নোক্ত প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায় : ১. স্বচ্ছ পদ্ধতিতে নিয়োগকৃত শিক্ষকদের ইউনেস্কো-আইএলও সুপারিশ মোতাবেক সমাজে শিক্ষকতা পেশার গুরুত্ব ও মর্যাদা তুলে ধরতে সক্ষম এমন বেতনভাতা প্রদান এবং সমযোগ্যতাসম্পন্ন, অপরাপর পেশায় নিয়োজিতদের সঙ্গে তুলনায় শিক্ষকের বেতন অধিকতর সমতাযুক্তভাবে নির্ধারণ; ২. শিক্ষক সংগঠনগুলো ও সরকারের যৌথ উদ্যোগে শিক্ষকদের জন্য তাদের পেশার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ আচরণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ; ৩. পাঠদান পদ্ধতির অব্যাহত উন্নয়ন; ৪. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি প্রবর্তন, পরীক্ষাপদ্ধতির যুগোপযোগী সংস্কার ও পাবলিক পরীক্ষার ক্রমান্বয়ে বিলোপের উদ্যোগ গ্রহণ; ৫. শিক্ষকদের পাঠদান পর্যবেক্ষণ ও প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক মান উন্নীতকরণের লক্ষ্যে একটি প্রতিষ্ঠানে আকস্মিক একাডেমিক পরিদর্শন; ৬. শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত বিষয়ভিত্তিক ও ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের প্রশিক্ষণের কর্মসূচি গ্রহণ; ৭. শিক্ষকদের গবেষণাকর্মে উৎসাহিত করতে বিশেষ বৃত্তি প্রদান।

শিক্ষকতাকে অনেক মহান ব্রত মনে করলেও সময়ের বিবর্তনে আজ তা এক ভিন্নধর্মী পেশা। যেখানে শুধু ত্যাগ নয়, ভোগের স্পৃহাও উপস্থিত। শিক্ষকের সমান যোগ্যতার অধিকারী অন্য পেশার কারো থেকেই অর্থে, মর্যাদায়, পোশাক-পরিচ্ছদে তার (শিক্ষকের) স্ত্রী-পুত্র-কন্যাসহ পরিবারের সদস্যরা তাকে পেছনে দেখতে রাজি নন! নিজেরাও কারো কাছ থেকে এক পা পেছনে থাকতে রাজি নন। বিশ্বব্যাপী মূল্যবোধের যে পরিবর্তন হয়েছে, শিক্ষক বা তার পরিবারও তার বাইরে নয়! যে বিবেচনায় শিক্ষক আর পুরনো দিনের ‘গুরু’ নন, পেশাজীবী। শিক্ষকদের প্রাইভেট টিউশনি করার বাস্তব কারণগুলোর যথাযথ মূল্যায়ন করে শিক্ষকতা পেশাকে আকর্ষণীয় করে প্রাপ্য মর্যাদার যথাযথ স্থানে বসানো সেজন্যই আজ বড় জরুরি। সংশ্লিষ্ট সবার উপলব্ধি করা দরকার যে, অনাহার-অর্ধাহারক্লিষ্ট শিক্ষক দিয়ে আর যাই হোক শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়। তার মানবিক চাহিদাগুলো পূরণ না করে শুধু তত্ত্বকথা, উপদেশ-নির্দেশ দিয়ে কোনো কাজ হবে না!
principalqfahmed@yahoo.com

লেখক : বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও চেয়ারম্যান, ‘মানব-উন্নয়ন উদ্যোগ’
বিস্তারিত পড়ুন....

শুক্রবার, ১৩ জুন, ২০০৮

নার্গিস আছর খানমের সাথে কিছুক্ষণ

মে ২০০৮ সংখ্যার ফুলকুঁড়ি পত্রিকায় বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম স্ত্রী সম্পর্কে নিম্নোক্ত লেখাগুলো পড়লাম। লেখক মাহবুবুল হক। প্রবন্ধের নাম নার্গিস আছর খানমের সাথে কিছুক্ষণ। ১৯৮২ সালের লেখক ইংল্যান্ডে গিয়ে নার্গিস আছর খানমের সাথে দেখা করেছিলেন। লেখাটি ছোটদের জন্য হলেও লেখক কিছু নতুন কথা বলেছেন। আমি এই তথ্যগুলো জানতাম না। এজন্য আমার কাছে বিষয়টা অন্যরকম মনে হয়েছে। বাংলাবাজারে নার্গিস আছর খানমের একটি জায়গা ছিল। সেটা 'খোশরোজ কিতাব মহল' এর মালিক মহীউদ্দিনকে তিনি দান করেছিলেন। ৬০ বৎসর থেকে জায়গাটি দলিল ছাড়াই তিনি ভোগদখল করছিলেন। সেটার দলিল করার জন্য লেখকের ইংল্যান্ডে যাওয়ার প্রয়োজন পড়েছিল। সেই প্রসঙ্গে নার্গিস খানমের সাথে লেখক দেখা করেছিলেন। তাঁর সম্পর্কে বলতে গিয়ে লেখক কিছু মন্তব্য করেছিলেন। এই মন্তব্যগুলোর মধ্যে আমার সংশয়ের জায়গাগুলো উল্লেখ করছি।

ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারে বসবাস করতেন আমাদের সকলের প্রিয় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম স্ত্রী নার্গিস আছর খানম। তাঁর সম্পর্কে অনেক কথা আছে, বড় হলে তোমরা জানতে পারবে। আপাতত: এইটুকু জেনে রাখ স্ত্রী হলেও কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর সাথে সংসার করতে পারেননি। তাঁরা একত্রে বসবাস করতে পারেননি। এসব অনেক বড় ষড়যন্ত্র! অনেক বড় করুণ কাহিনী! যে কাহিনীর জন্য শুধু নজরুল বা নার্গিস ক্ষতিগ্রস্থ হননি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি আমরা সবাই। বাংলার মুসলমানরাই সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলো।... আমরা কথা বলছিলাম আর ভাবছিলাম কত ভাল হতো যদি কবি নজরুল নার্গিসের সাথে সংসার করতে পারতেন। কী অদম্য স্মৃতিশক্তি নার্গিসের! নার্গিসের চোখে স্মৃতির সাগর যেন ভেসে উঠছে! নীল নীল অতলান্ত সে সাগর! কতো গান! কতো কবিতা! কতো স্মৃতি! নজরুল এমন করলেন কেন? কেন এই মেধাবী, গুণবতি ও মমতাময়ী নারীকে তিনি উপেক্ষা করলেন? কেন এই স্ফটিকসুন্দর হিরা-জহরতকে ফেলে তিনি অন্য সম্প্রদায়ের আর এক নারীকে গ্রহণ করেছিলেন। নার্গিসের ঐশ্বর্য ও বৈভবে যদি নজরুল ভাগিদার হতে পারতেন, তাহলেও তো নজরুল বেঁচে যেতেন। অভাব ও দারিদ্রের মধ্যে তাঁকে জীবন কাটাতে হতো না! অসুস্থ স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য এবং সন্তান সন্ততির ভরণ-পোষণের জন্য বাধ্য হয়ে বিজাতীয় সঙ্গীত তাঁকে রচনা করতে হতো না। নার্গিস যা যা বলেছেন, সব কথা এখানে বলা যাবে না, তার আধো আধো কথায় আমরা যা বুঝেছি, তাতে কবিনজরুল নিশ্চিতভাবেই ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিলেন।

এই ষড়যন্ত্র কে করেছিল? কি সেই ষড়যন্ত্র এই সব বিবিধ প্রশ্নের উত্তর লেখাটিতে নেই। সম্ভবত শিশুদের পত্রিকা বলেই তিনি আলোচনার গভীরে যাননি। কিন্তু এই ষড়যন্ত্রের স্বরূপ উদঘাটিত হওয়া দরকার। না হলে আমাদের জাতীয় কবি নজরুল ইসলামকে বরং অবমাননাই করা হবে। তাঁর জীবন সম্পর্কে প্রতিটি সত্যি ঘটনা প্রকাশ্যে আলোচিত হওয়া উচিত। নজরুল নিজে যেমন কোন কিছুর চোখ রাঙানোতে ভয় পেতেন না। কোন নিষেধাজ্ঞাকে প্রশ্রয় দেন নি, ঠিক তেমনি তার জীবনের অজানা অংশগুলোর উন্মুক্ত আলোচনাতেও কোন সংশয় থাকা উচিত নয়।

বিস্তারিত পড়ুন....

বুধবার, ২৩ এপ্রিল, ২০০৮

মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে

মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে

অভিজিৎ রায়
ফরিদ আহমেদ

মহাবিশ্বে প্রাণ নিয়ে আগ্রহ মানুষের আদিকাল থেকেই কি আছে? পৃথিবীতে প্রাণ এলো কি করে। পৃথিবী ছাড়া মহাবিশ্বের অন্য কোন জায়গায় কি প্রাণের উদ্ভব হয়েছে? বুদ্ধিমান প্রাণী না হোক অন্তত প্রাথমিক স্তরের কোন প্রাণী কি কোথাও নেই? একমাত্র পৃথিবীতেই কি প্রাণের উদ্ভব হয়েছে? ইত্যাদি নানা বিবিধ প্রশ্নের উত্তর আলোচনা করা হয়েছে এই মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে বইতে। বইটির দ্বিতীয় ফ্লাপে যা রয়েছে তা এরকম:-

এই অনন্ত মহাবিশ্বে আমরা কি নি:সঙ্গ, নাকি প্রাণ আর বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ঘটেছে মহাবিশ্বের অন্যত্রও? আর প্রাণ জিনিসটাই বা আসলে কী? এর উদ্ভব হয় কোথা থেকে? কীভাবে? - এ ধরনের প্রশ্ন মানুষের মনে এসেছে সেই কতকাল আগে! প্রচলিত আধ্যাত্মিক এবং বিশ্বাসনির্ভর মতবাদের বিপরীতে এ গ্রন্থে স্থান পেয়েছে সুস্থ ধারার বৈজ্ঞানিক আলোচনা। মুক্তমনার সাংগঠনিক সম্পাদক এবং জনপ্রিয় বিজ্ঞান লেখক অভিজিৎ রায় এবং ফরিদ আহমেদ বিজ্ঞানের সর্বাধুনিক তথ্যের ভিত্তিতে প্রাণের উৎপত্তির রহস্য সন্ধান করেছেন, শুধু এই পৃথিবীতে নয়, এমনকি পৃথিবীরে বাইরেও। এ দু'লেখক সম্মিলিতভাবে নয়টি অধ্যায়ের মাধ্যমে জীবনের বস্তুগত সংগঠনের রহস্যকে অত্যন্ত প্রাণবন্ত ভাষায় সাধারণ পাঠকদের জন্য তুলে ধরেছেন। এ বইয়ের মাধ্যমে পাঠকেরা যেমনিভাবে জানতে পারবেন প্রাণের উদ্ভব, বিকাশ এবং এর বিবর্তনের ইতিহাসকে, তেমনিভাবে আগ্রহী হবেন আমাদের মহাবিশ্বের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি গ্রহ-নক্ষত্রের কোথাও প্রাণের বিকাশ ঘটার সম্ভাবতার ব্যাপারে; সেইসাথে তারা ঝালিয়ে নিতে পারবেন বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক ধ্যান-ধারণাগুলোকে। সবমিলিয়ে এ একটি আধুনিক তথ্যসমৃদ্ধ প্রাণবন্ত এবং চমকপ্রদ বই। জীবন উপভোগের পাশাপাশি জীবনকে জানার, জীবনকে বোঝার।

পাঠ উপভোগ্য, জ্ঞান সঞ্চারী, চিন্তার উদ্রেককারী বইটির সূচীপত্রে রয়েছে:

· প্রাণের প্রাণ জাগিছে তোমারি প্রাণে

· জীবনের প্রাণ রাসায়নিক উপাদান

· জীবনের উদ্ভবের সম্ভাব্য ধারণাগুলো

· অজৈবজনি: জীবনের রাসায়নিক উৎপত্তি

· প্রাণের উৎপত্তির ধাপগুলো

· ভিনগ্রহে প্রাণ এবং বুদ্ধিমত্তার খোঁজে

· বহির্বিশ্বে জীবনের উৎপত্তির খোঁজে

· মহাবিশ্বে প্রাণ এবং বুদ্ধিমত্তার সম্ভাব্যতা

· মহাজাগতিক ঠিকানার খোঁজে

এই বইটি www.mukto-mona.com ওয়েব সাইট থেকে বিনামূল্যে ডাউনলোড করা যাবে।

প্রচ্ছদ : প্রতীক ডট ডিজাইন

ISBN: 984-415-212-7
বিস্তারিত পড়ুন....

রবিবার, ২০ এপ্রিল, ২০০৮

শিক্ষক ও শিক্ষকতা। ৪য় পর্ব

একজন শিক্ষক বদলে দিতে পারেন শিক্ষার্থীর জীবন শিরোনামে বেশ কয়েকজন শিক্ষকের আলোচনা। আজ রয়েছে ড. মো. সাইফুল আলম এর বক্তব্য।
ড. মো. সাইফুল আলম
শিক্ষাবিদ। প্রাধ্যক্ষ, মাস্টার 'দা সূর্যসেন হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শিশুরা ছোটকাল থেকে যেমন বাবা-মার কাছ থেকে শিখে থাকে, তেমনি ছাত্রজীবনে শিক্ষকের আদর্শকে তারা কিন্তু অনুসরণ করে। তাই একজন শিক্ষকের চরিত্র এমন হওয়া উচিত, যা ছাত্ররা অনুসরণ করতে পারে। বিশেষ করে কতগুলো দিক আছে, কর্তব্যনিষ্ঠা, সততা, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ- এই বিষয়গুলো শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের কাছ থেকে শিখতে পারে। শিক্ষকরা নিজে যদি যথাসময়ে শ্রেণীকক্ষে উপস্থিত হন, তাহলে শিক্ষার্থীরা কখনোই দেরি করে আসতে পারবে না। এভাবে নিজে সময়নিষ্ঠ হয়েও শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের শেখাতে পারেন। আমার বিশ্বাস, আমি নিজে যদি পড়ালেখা করি, আমার ছাত্র পড়ালেখা করতে বাধ্য হবে। তাই, আমাদের নিজেদেরও পড়াশেখার মধ্যে থাকা উচিত। আমি নিজে যদি লাইব্রেরিমুখী না হই, তাহলে আমার ছাত্র লাইব্রেরিতে যাবে- এটা আমি কী করে আশা করি।

আমি মনে করি, ছাত্র আছে বলেই আমি আছি। আবার শিক্ষক না থাকলে ছাত্র-শিক্ষক যে ধারণা সেটা থাকবে না। ছাত্রদের সঙ্গে আমার যদি সম্পর্ক না থাকে, ওরা যদি আমাকে না নিতে পারে বা আমি যদি ওদের কাছে পৌঁছাতে না পারি, তাহলে আমি ওদেরকে কীভাবে কিছু দেব? ছাত্ররা আমর কাছ থেকে যদি কিছু নিতে না পারে, তাহলে আমি যত বড় শিক্ষাবিদ-ই হই না কেন, লাভ হবে না।

শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্ব বিকাশসহ আনুষঙ্গিক যে বিষয়গুলো আছে, সেই বিষয়গুলোয় আমাকে পথ দেখিয়ে দিতে হবে। পথ দিয়ে আমি হাঁটব না, তাদেরকেই আমাকে হাটাতে হবে। সে যেন হাঁটতে পারে, কোনো সমস্যা হলে সে যেন আবার আমার কাছে ফিরে আসতে পারে, আমি যেন আবার তাকাতে পারি- এই পরিবেশ আমরা যতদিন পর্যন্ত নিশ্চিত করতে না পারব, ততদিন পর্যন্ত 'টিচিং লার্নিং' যে প্রসেস এই প্রসেসটা ব্যাহত হবেই। ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে যে সম্পর্কটা আছে, সেটা খোলামেলা হতে হবে। এজন্য ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে যে সম্পর্কটা আছ, সেটা খোলামেলা হতে হবে। এজন্য ছাত্র-শিক্ষকদের পাস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। দলীয় সংকীর্ণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিত্ব বিকাশের জন্য যে শিক্ষা তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিতে হবে আমাদের সবার। তাহলেই হয়তো আমরা ভবিষ্যতে একটি সুন্দর বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতে পারব।

বিস্তারিত পড়ুন....

শনিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০০৮

শিক্ষক ও শিক্ষকতা। ৩য় পর্ব

একজন শিক্ষক বদলে দিতে পারেন শিক্ষার্থীর জীবন শিরোনামে বেশ কয়েকজন শিক্ষকের আলোচনা। আজ রয়েছে ড. মুহাম্মদ সামাদ এর বক্তব্য।

ড. মুহাম্মদ সামাদ

কবি ও শিক্ষাবিদ। অধ্যাপক, সমাজ কল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শিশুকাল থেকে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জীবন গড়ার ক্ষেত্রে শিক্ষকের ভূমিকা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তির বিকাশ, মেধা ও মননকে সমাজের কল্যাণে কাজে লাগানো ও তাদেরকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের ভূমিকা অপরিসীম। আমি যখন ছাত্র ছিলাম, আমার শিক্ষকরা বড় হওয়ার যে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, সেজন্যই আমি বর্তমান অবস্থানে আসতে পেরেছি। তাঁরা সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা দিয়ে আমাদের যত্ন নিতেন। কোনো পড়া না বুঝতে পারলে বাড়িতে গিযে বুঝে আসতেন এবং এর জন্য কোন অর্থকড়ি তো নিতেনই নাম, উপরন্তু আমাদের আদর-আপ্যায়ন করতেন।

জ্ঞান অর্জনের জন্য তাঁরা আমাদের পাট্য বইয়ের বাইরেও বিভিন্ন বই পড়তে উৎসাহিত করতেন। বিখ্যাত ব্যক্তি, কবি, লেখক, বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের লেখা ও জীবনী পড়তে উৎসাহিত করতেন। এর ভেতর দিয়ে তাঁরা বড় মানুষ হওয়ার একটা স্বপ্ন তৈরি করে দিতেন।

একজন শিক্ষক শ্রেণীকক্ষে যাওয়ার আগে নিজে কতটা প্রস্তুতি নেন, কতটা যত্ন ও আন্তরিকতার সঙ্গে পড়ান ও কতটা সময়মতো ক্লাসে আসেন, এ বিষয়গুলো শিক্ষকদের কাছ থেকে শিক্ষার্থীরা শিখে থাকে এবং তা পরবর্তী সময়ে অনুসরণ করে। একজন শিক্ষক শুধু তাঁর পাঠ্যবিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রাসঙ্গিক বিষয়ে আরও বেশি বই, পত্রপত্রিকা পাঠে উৎসাহিত করলে তাদের মেধাকে আরও শাণিত ও সমৃদ্ধ করবে। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে শিক্ষকরাই মুখ্য। তাই শিক্ষকের জ্ঞান, সততা, নিষ্ঠা, মানবিকতা, ভবিষ্যৎ স্বপ্ন দেখানোর ক্ষমতা প্রভৃতি ছাত্রছাত্রীদের ব্যাপকভাবে আলোড়িত ও প্রভাবিত করে। কাজেই শিক্ষকের নৈতিক অবস্থঅন ও সামাজিক ভূমিকা ছাত্রছাত্রীদের জীবন গড়ার ক্ষেত্রে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। পুরোনো জ্ঞানের যাচাই ও নতুন নতুন জ্ঞান তৈরির জন্য শিক্ষক নিজে যেমন গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হবেন, তেমনি শিক্ষার্থীদের সজীব মেধাকে কাজে লাগিয়ে সমাজ বিনির্মাণে ও অগ্রগতির ধারাকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করবেন। যেসব শিক্ষকরা ক্লাসে আসেন না, অথচ অধিক অর্থোপার্জনের জন্য বাইরে ক্লাস নেন বা অন্য কাজে ব্যস্ত থাকেন, তাঁদের অন্য পেশায় যুক্ত হওয়াই ভালো।

বিস্তারিত পড়ুন....

শুক্রবার, ১৮ এপ্রিল, ২০০৮

শিক্ষক ও শিক্ষকতা। ২য় পর্ব

একজন শিক্ষক বদলে দিতে পারেন শিক্ষার্থীর জীবন শিরোনামে বেশ কয়েকজন শিক্ষকের আলোচনা। আজ রয়েছে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এর বক্তব্য।

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ। সভাপতি, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র

কাকে আমরা অনুসরণ করি যাঁর কাছে আমরা পরাজিত হই। তাঁর মূল্যবোধ, কথা, আদর্শ, সাবলীলতা, স্বস্ফুর্ততা এগুলো যখন আমার চেয়ে বেশি হয়ে যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাঁর প্রতি আমার মাথা নত হয়ে আসে। সে আমার ওপর প্রভাবিত করতে শুরু করে। এক ধরনের মানুষ থাকে, যাঁদের মধ্যে কারিশমা থাকে। কারিশমার জন্যই অনেক মানুষের প্রতিকৃতিতে জ্যোতির বলয় আঁকা থাকে। আসলে কী বলয় ছিল? ছিল না। কিন্তু তাদেঁর ব্যক্তিত্বের মধ্যে একটা জ্যোতির্ময় কিছু ছিল। তাঁর সামনে পড়লেই মানুষের মন একটা আলোতে ভরে যেত। সেই রকম যদি কোনো মানুষের মধ্যে আমি অসাধারণত্ব অনুভব করি, সঙ্গে সঙ্গে আমি সেই মানুষ দ্বারা সম্মোহিত হওয়ার চেষ্টা করি। এটা যদি শিক্ষকের ক্ষেত্রে হয়, তাহলে তিনি ভালো শিক্ষক হবেন। তাঁর দ্বারা শিক্ষার্থীরা উজ্জীবিত হবে, প্রভাবিত হবে। তিনি শিক্ষার্থীর জীবনকে বদলে দিতে পারবেন। তাঁর প্রতিটি কথা ছাত্রদের কাছে অসাধারণ মনে হবে। সে যুক্তিগুলোও তিনি দিতে পারবেন, কেন এটা করা উচিত, কেন এই পথে চলা উচিত।

আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম তখন অন্তত ২০ জন অধ্যাপক ছিলেন, যাঁদের নাম সারা জাতি জানত। তাঁরা ক্লাশরুমের বাইরে সব জাতিকে তাঁদের কথা-বার্তা চিন্তা-চেতনা দ্বারা প্রভাবিত করেছিলেন তখন। পাঠ্যবই তাঁদের পড়াতে হবে। পাঠ্যবইয়ের মধ্যে যে আনন্দ, বিস্ময়, শিহরণগুলো, সেগুলো যদি তিনি একবার ছাত্রদের সামনে তুলে ধরতে পারেন, তাহলে ছাত্রদের মনটা জেগে যাবে। তো একবার মানুষের মন জেগে গেলে সে হিমালয় পার হয়ে চলে যায়। একজন ভালো শিক্ষকের দায়িত্ব হচ্ছে এটা। যিনি গড়বেন, সেই আদর্শ, মূল্যবোধ, সততা তাঁর মধ্যে থাকতে হবে। তাহলেই একটা ছাত্র প্রভাবিত হবে। আপনি আচরি ধর্ম, পরেরে শেখাও। নিজে ভালো হওয়াই হচ্ছে অন্যকে ভালো করার উপায়। এটা বক্তৃতা দিয়ে, দীক্ষা দিয়ে, শিক্ষা দিয়ে, পাঠ্যবইয়ে লিখে কোনো কিছুতেই কিছু করা যায় না।

বিস্তারিত পড়ুন....

বুধবার, ১৬ এপ্রিল, ২০০৮

শিক্ষক ও শিক্ষকতা - ১

শিক্ষকতা সম্পর্কে আরও কিছু তথ্য চোখে পড়ল। প্রথম আলো পত্রিকার ১১ এপ্রিল ২০০৮ সংখ্যায় 'পড়াশোনা' বিভাগে একজন শিক্ষক বদলে দিতে পারেন শিক্ষার্থীর জীবন শিরোনামে বেশ কয়েকজন শিক্ষকের আলোচনা ছাপানো হয়েছে।

শিক্ষক, শিক্ষার্থী, শিক্ষকতা বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে তাঁরা প্রত্যেকেই সংক্ষিপ্ত মতামত দিয়েছেন। আমি এখানে এর আংশিক তুলে ধরছি। আজ তুলে ধরছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথিতযশা শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর কথা।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ। অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষকতা পেশা অন্য যে কোন পেশা থেকে আলাদা। শিক্ষকদের অনেক সামাজিক দায়িত্ব থাকে। আর যাঁরা শিক্ষকতাকে বেছে নেন, তাঁরা সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই এ পেশায় আসেন। একজন শিক্ষক হিসেবে চরিতার্থতা শুধু কয়েকজন ভারো ছাত্র তৈরি করাতেই নয়; তাঁর দ্বারা কতজন ভালো মানুষ তৈরি হলো, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষঅর্থীদের নানাভাবে উদ্দীপ্ত-উদ্বুদ্ধ করা তাঁদের দায়িত্ব।

শিক্ষকের দ্বারা শিক্ষার্থীরা বেশ ভালোভাবে প্রভাবিত হয়। শিক্ষকেরা ছাত্রদের কাছে পথপ্রদর্শক ও বীরের মতো। শিক্ষার্থীরা তাঁদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হতে চায়, তাঁকে অনুকরণ-অনুসরণ করতে চায়। শিক্ষকের আদর্শ ও কর্তব্যনিষ্ঠা দুটোই শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষক আদর্শবাদী মানুষ হবেন। তিনি যে নিজে শুধু ন্যায়ের পথে থাকবেন তা নয়, যে কোনো অন্যায়ের বিপক্ষে অবস্থান নেবেন। তিনি অন্যের দু:খে কাতর হবেন, সুখের অংশীদার হবেন। একজন শিক্ষকের মধ্যে এসব গুণ থাকলে তা শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করে। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের কাছ থেকে আসা করে তাঁরা মেরুদণ্ডহীন মানুষ হবেন না, তাঁরা ন্যায়ের পক্ষে থাকবেন।

শিক্ষকদের নিজের কাছেই জবাবদিহিতা থাকা উচিত। নিয়মিতক্লাস নেওয়া, কর্তব্য পালন করা, ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার প্রতি আগ্রহী করা- শিক্ষককে এসব গুরুদায়িত্ব পালন করতে হবে। শিক্ষক চাইবেন ছাত্ররা জ্ঞানের অনুশীলন করুক, তাঁরা স্বার্থপর, আত্মসর্বস্ব না হয়ে মানুষ হিসেবে যেন ভালো হয়, আবার ছাত্র হিসেবেও যেন ভালো হয়। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের কাছেই আদর্শ, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের শিক্ষা পেয়ে থাকে। তাই তাঁদের উচিত শিক্ষার্থীদের কাছে নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষা করা। শিক্ষকরা সজীব শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। তাই তাঁদের নিজেদের মধ্যেও সজীবতা থাকতে হবে। শিক্ষকদের মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ থাকাটাও জরুরি। তবে বর্তমান সময়ে শিক্ষকদের তেমন সামাজিক মর্যাদা নেই। এ কারণে তাঁরা অর্থকে সামাজিক মর্যাদা লাভের উপায় হিসেবে মনে করছে। এর ফলে তাঁরা বেশি অর্থ উপার্জনের মাধ্যমে সামাজিক মর্যাদা অর্জনের চেষ্টা করছে। যাই হোক, জ্ঞান বিতরণের যে বিষয়টি তা স্বত:স্ফূর্তভাবে আসা উচিত, এর সঙ্গে কোন ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকা উচিত নয়।

বিস্তারিত পড়ুন....

রবিবার, ৬ এপ্রিল, ২০০৮

শিক্ষক সম্পর্কিত

আনিসুর রহমানের 'পথ থেকে পাওয়া' নামে একটি রচনা এই কয়দিন খুঁজছিলাম। প্রকাশিত হয়েছে চলতিপত্র পত্রিকায় ১৯৯৭ সালের ০৩ মার্চ তারিখে। সেখানে শিক্ষক সম্পর্কে তার একটি অভিজ্ঞতার কথা তিনি আবেগ মিশিয়ে বলেছেন।

শিক্ষক সবাই একসমান নন। কেউ কেউ ভীষণ প্রেরণাদায়ী। কেউ ওরকম নন। টেক্সস্টবুকের মতো পড়িয়ে যাচ্ছেন। দুজন শিক্ষক আমাকে দারুণ আকৃষ্ট করে। একজনের নাম হচ্ছে Gerchencorn রাশান - আমার যতদূর মনে পড়ে। ইতিহাসের শিক্ষক তিনি। কিন্তু ভয়ানক আনন্দময় ছিল তার লেকচার। আরো যেটা আমাকে ইমপ্রেস করেছিল সেটা হলো ছাত্রদের প্রশ্ন শোনার আকুলতা। তিনি কোনো লেকচার দেবেন না- ছাত্রদের বলবেন তোমরা প্রশ্ন করো। প্রশ্ন শুনতে তিনি বড়ই আগ্রহী ছিলেন। পপুলার টিচার্ খুব বড়ো ক্লাশ। অনেক পেছন থেকে কেউ প্রশ্ন করলে হয়তো তিনি শুনতে পেলেন না তখন তিনি স্টেজ থেকে নেমে এসে একবারে কাছে গিয়ে মাথা ঝুকিয়ে প্রশ্নটা জেনে নিতেন। এরকম শিক্ষক আমি আগে দেখিনি। আমি তাতে মুগ্ধ হয়েছি। আরেকজন ছিলেন Liontiev, তিনিও রাশান। তিনি মাইক্রো ইকোনোমিক থিওরি পড়াতেন। প্রথম দিন ক্লাশে এসেই দু'হাত প্রসারিত করে বললেন, জেন্টলম্যান, চিন্তা করো, তোমার মনে যদি ভয় হয় বোকার মতো প্রশ্ন আমি করতে চাই না, কিন্তু তুমি জানো না এ প্রশ্নের মধ্যে কি গভীরতা থাকতে পারে। তুমি যদি প্রশ্নটা না করো তাহলে তুমি অর্থনীতি বিজ্ঞানের অগ্রগতির পথে অন্তরায়। হয়তো এই প্রশ্নের উত্তরে অর্থনীতি বিজ্ঞানটা এগিয়ে যাবে।

বিস্তারিত পড়ুন....

মঙ্গলবার, ১১ মার্চ, ২০০৮

কাজরী:

* কাজরী:- এক ধরণের গান। এই গান সাধারণত বর্ষার গান বলেই লোকে জানে। এটা বর্ষা ঋতুর গান এবং বিরহ বর্ণনারও। ভারতের উত্তর প্রদেশের গান এটা, লোকসংগীত। কেউ 'কাজরী' বলে আবার কেউ বলে 'কজলী'। রাধাকৃষ্ণের লীলাখেলার পটভূমি নিয়ে রচিত এই গানগুলি শৃঙ্গার রসে ভরা। উত্তর প্রদেশের মীর্জাপুর আর বানারস এলাহাবাদ অঞ্চলে এই গান বেশী গাওয়া হয়।

কাজরী একা গাওয়ার গান নয়। প্রধান গায়ক বা গায়িকার সঙ্গে কয়েকজন মিলে এই গান গাওয়া হয়। তবে দুজনেও গাওয়া যয়। 'কাজরী' বা 'কজলী' আধ্যাত্মিক দেবীও বটে। ভাদ্র মাসের তৃতীয়পক্ষের তৃতীয়া রাতে মেয়েরা নতুন শাড়ী পরে অলংকারে সেজে সারারাত কাজরী গান গেয়ে কাজরী দেবীর পূজা করে। হিন্দু-মুসলমান সকলে এক সঙ্গে বসে এই গান শোনে।
বিস্তারিত পড়ুন....

সোমবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০০৮

কার্লসাগান: এক মহাজাগতিক পথিক

নারায়ণগঞ্জের 'ডিসকাশন প্রজেক্ট' বাংলাদেশের একটি সুপরিচিত নাম। পেশাদার বিজ্ঞান বক্তা হিসেবে এই সংগঠনের উদ্যোক্ত (প্রতিষ্ঠাতা) আসিফ বেশ নাম করেছেন। আমি নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে তার বাসায় গিয়েছিলাম। তাকে দেখতে ও ডিসকাশন প্রজেক্টকে জানতে। আসিফ এর সংগ্রহ দেখে আমি সত্যিই অবাক হয়েছিলাম। তার সংগ্রহে অনেক পুরনো বই আছে যেগুলো দুর্লভ। আসিফ এর প্রধান আগ্রহ মহাকাশ নিয়ে। মহাকাশ বিজ্ঞানে তাকে একজন অপ্রাতিষ্ঠানিক পণ্ডিত বলা যায়। তার বিজ্ঞানবক্তৃতাগুলোও মহাকাশবিজ্ঞান নিয়ে। ফেব্রুয়ারি ২০০১ সালে সাহিত্য প্রকাশ থেকে তার একটি বই বের হয়েছে। নাম কার্লসাগান: এক মহাজাগতিক পথিক। বইটার নামকরণেই বোঝা যায় বিষয়বস্তুর কথা। কার্লসাগান তার মহাকাশ বিষয়ক বক্তৃতা দিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত একজন ব্যক্তিত্ব। তার একাধিক ভিডিও আমি দেখেছি। এই মুহূর্তে নামগুলো মনে পড়ছেনা। একটি নাম বোধ হয় কসমস

প্রাণের উৎপত্তি, প্রাকৃতিক নির্বাচন, মঙ্গলগ্রহ সম্পর্কে আলোচনা, ভিনগ্রহে প্রাণের সম্ভাবনা ইত্যাদি আকর্ষণীয় বিষয় নিয়ে বইটি সাজানো। আসিফ সুবক্তা তো আছেনই, তিনি সুলেখকও বটে। বইটির ভূমিকার একটি প্যারা উদ্ধৃত করার লোভ সামলানো গেল না।
কতটুকু জানলে আমাদের লাভ হবে আর কতটুকু না জানলে চলবে এই ভেবে কখনো জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা হতে পারে না। খুব কম ক্ষেত্রেই এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। পড়াশোনার ক্ষেত্রে এধরনের মনোভাব আমাদের জ্ঞানের বিকাশকে পুরোপুরি রুদ্ধ করে দেবে। প্রত্যেকে জ্ঞানচর্চা করেছে কৌতুহল থেকে, মনের অভাববোধ তেকে, তার অসংখ্য প্রমাণ আছে। পরে দেখা গেছে এগুলো দ্বারা সমাজ ভালোভাবে উপকৃত হয়েছে। একবার ইউক্লিডের কাছে শিক্ষারত জনৈক ছাত্র জ্যামিতির প্রথম পাঠ নেয়ার পর জিগ্যেস করেছিলেন, "এইগুলো শিখে আমার কী লাভ হবে?" এই কথা শুনে ইউক্লিড তাঁর দাসকে ডাকলেন এবং বললেন, "একে একটি মুদ্রা দান কর, কারণ সে যা শেখে তার দ্বারা সব সময় লাভ করতে চায়।" আজকালও এরকম অসংখ্য নির্বোধ আছেন যাঁরা জ্ঞানার্জনকে হাতেনাতে লাভজনক হিসেবে দেখতে চান। তাঁরা এতে সফল হলে জ্ঞান অর্জন বিষয়টা সম্পূর্ণ অবলুপ্ত হবে। আমাদের দেশে এমনি চিন্তার চরম বিকাশ ঘটেছে। আমরা নাম্বারবাজ জাতিতে রূপান্তরিত হয়েছি যার সমর্থন যোগাচ্ছে দেশের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা পদ্ধতি। এটা এখন এমন অবস্থায় পৌছে গেছে যে জ্ঞান অর্জন বিষয়টা পুরোপুরি অন্তর্ধানের পথে। একবার ব্রিটিশ পদার্থবিজ্ঞানী মাইকেল ফ্যারাডে (১৭৯১-১৮৬৭)-কে বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় আবেশ আবিষ্কার সম্পর্কে রাণী ভিক্টোরিয়া জিগ্যেস করেছিলেন, "এর ব্যবহার কি?" তখন ফ্যারাডে উত্তর দিয়েছিলেন, "ম্যাডাম সদ্যোজাত শিশুর উপযোগিতা কি?" আজ ১৫০ বছর পরে আমরা জানি বিদ্যূতের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুললে মানুষ হাসবে।
আসিফ নিজে কার্ল সাগানের প্রতি প্রবলভাবে আসক্ত এটা তার একাধিক বক্তৃতাতেও বোঝা যায়। তিনি এই বইটা লিখে তার ভাললাগা ব্যক্তিত্ব ও লেখাগুলোকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য করে তুলেছেন। সহজ ভাষায়, বিজ্ঞানের জটিল পরিভাষাকে এড়িয়ে বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে উপস্থাপন করা মোটেও সহজ নয়। সেই সহজ কাজটি আসিফ দারুণভাবে করতে পেরেছেন এই জন্য তিনি ধন্যবাদার্হ হয়ে রইলেন।
বিস্তারিত পড়ুন....

বৃহস্পতিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০০৮

কিছু কথা

বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা এমন হয়ে গেছে যে এখন আমরা পড়াশোনা করি শুধুমাত্র অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার হিসেবে। শিক্ষা আমাদের আর বন্ধু নয়। শিক্ষাকে আমরা দাস বানিয়ে ফেলেছি। একটি সার্টিফিকেট পেলেই হল। সেখানে যদি কিছু অতিরিক্ত নম্বর থাকে তাহলে তো সোনায় সোহাগা। ভাল আয়ের চাকুরী অবশ্যম্ভাবী। চাকুরীর পিছনে ঘুরতে হবে না। চাকুরীই পিছনে পিছনে ঘুরবে।

কিন্তু বাস্তব অবস্থা এমন হওয়ার কথা ছিল না। ব্রিটিশ আমলের শিক্ষা কমিশন (১৮৮২ সালের হান্টার কমিশন) দুই রকম শিক্ষাক্রমের প্রস্তাব করা হয়েছিল। এবং বি তে যারা পড়বে তারা জ্ঞানার্জনের জন্য পড়াশোনা করবে আর যারা (সাহিত্যধর্মী) বি তে পড়বে তারা অর্থউপার্জনের উদ্দেশ্যে পড়বে। বি তে ছিল বিভিন্ন টেকনিক্যাল বিষয়গুলো (বাণিজ্য ও কারিগরি বিদ্যা সম্পর্কিত)। বর্তমানে আমরা না বুঝে সন্তানকে তে পড়াই কিন্তু আশা করি যে, সে অর্থ উপার্জন করবে। এটা পাঠ্যক্রম অনুযায়ী সহজলভ্য নয়। ফলে আমাদের সন্তানেরা আটকে যায় বেকারত্বের ফাঁদে। এ অবস্থা একদিনে তৈরি হয়নি।

স্বাধীনতার পূর্বের চাইতে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে বাংলা ভাষায় বই প্রকাশের হার ব্যপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই তুলনায় পাঠক সংখ্যা বাড়েনি। অথচ পাঠক সংখ্যা বেড়ে যাওয়া উচিত ছিল। চিত্তরঞ্জন দাস তার মুক্তধারা নিয়ে বাংলা একাডেমির পাশে বই মেলা শুরু করলেন। প্রতি বছর বইমেলার পরিধি বাড়ছে। কিন্তু মোট শিক্ষিতের তুলনায় পাঠক সংখ্যা এখনও অনেক কম। আর বই বিক্রিও হয় শুধুমাত্র বইমেলার আয়োজনকে উপলক্ষ্য করে। বাঙালি মেলাতে বই কেনে। অন্যান্য মেলাতে পুতুল, জিলাপি, চুড়ি, ফিতা কিনতে যেমন আনন্দ পায় ঠিক তেমন বই মেলাতেও বই কিনতে তেমন আনন্দ পায়। তারা যেন আনন্দের জন্যই বই কেনে, জানার জন্য নয়। আর বছরের সারাটা সময় বইয়ের দোকানগুলো অলস বসে থাকে। বই বিক্রির হার কখনো কখনো শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। লেখকরাও এটা জানেন। তাদেরও লক্ষ্য থাকে বই মেলা। আমার কাছে বিষয়টা সম্পূর্ণভাবে বোধগম্যতার বাইরের বলে মনে হয়। এমনটা কেন হবে? বই পড়া কী শুধু আনন্দের ব্যাপার? বই পড়ে কি কোন জ্ঞানার্জন হয়না? বই পড়ে কি আমরা ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য কিছুই জানতে পারিনা? বোধহয় না। কারণ এ ধরণের বই পড়া হয় শুধুমাত্র একাডেমিক প্রয়োজনে। সমসাময়িক সাধারণ পাঠকেরা সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে সুখপাঠ্য গ্রন্থাবলি। কালজয়ী উপন্যাস, বা অনবদ্য কবিতার মর্ম বোঝার দায় খুব কম মানুষই বোধ করে।

তা সে যাই হোক। এই ব্লগটি আমার বই পড়া বিষয়ক বিভিন্ন অনুভূতির বহির্প্রকাশ। গ্রন্থপাঠ কখনো আনন্দের, কখনো দু:খের, কখনো আমি অবাক, আবার কখনও বা শিখে ফেলি অনেক কিছু। পাঠপরিক্রমার পাশাপাশি শিক্ষা সম্পর্কিত আমার বিভিন্ন ভাবনাগুলোকেও এখানে প্রকাশিত করব বলে প্রত্যাশা করি। বস্তুত: আমার পাঠঅভিজ্ঞতা ও পাঠ পরামর্শকে খুঁজে পাওয়া যাবে আমার এই পাঠাগার ব্লগে।
বিস্তারিত পড়ুন....
 

About Me

আমার ফটো
শিক্ষাজীবী। গ্রন্থপাঠ এবং ভ্রমণ আমার প্রিয় বিষয়।

শিশুদের বইয়ের ওয়েব সাইট

বইয়ের খোঁজ

আর্কাইভ