বৃহষ্পতিবার, ১৫ এপ্রিল, ২০১০

রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন- আশরাফ সিদ্দিকী (১ম অংশ)

রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন
ডক্টর আশরাফ সিদ্দিকী

ভূমিকা
বাংলাদেশের এক প্রত্যন্ত গ্রমাঞ্চল থেকে লেখক ডক্টর আশরাফ সিদ্দিকী পড়াশোনা করতে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত বিখ্যাত শান্তিনিকেতনে। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ লেখের চিন্তাভাবনা তথা জীবনদর্শনে এক সামগ্রিক পরিবর্তন এনে দিয়েছে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্যক্তিজীবনে সৌন্দর্য, আনন্দ ও বাঙালি সংস্কৃতির সাধনায় নিরন্তর রত ছিলেন। বিশ্ব ভ্রমণে ঋদ্ধকবি যে বৈশ্বিক আদর্শ অন্বেষণ করেছেন, নিজের মনে মননে তার প্রতিফলন অনুভব করেছেন, তার বাস্তবায়ন করেছেন স্বপ্রতিষ্ঠিত 'শান্তিনিকেতন' নামক প্রতিষ্ঠানটিতে।

গ্রন্থকার তার উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীতে পাঠকালীন সময়ে শান্তিনিকেতনের শিক্ষাপদ্ধতি, সাংস্কৃতিক উদারতা, ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক, প্রতিদিনের জীবনাচরণ, প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রতি ঘনিষ্ঠতা ইত্যাদির সাথে পরিচিত হয়ে মুগ্ধ হয়েছেন। মানুষ ও প্রকৃতির প্রতি এক অপার ভালোবাসার বীজ নিজের হৃদয়ে রোপন করেছেন। বিশ্বমানবতার আত্মার জয়গান নিজের বুকে অনুভব করেছেন। এইসব বিবিধ বিষয় নিয়েই আলোচ্য গ্রন্থ "শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ"। লেখকের সাংস্কৃতিক অন্বেষণের পূর্ণতা পেয়েছে এই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা গ্রহণ করতে এসে। তাই আলোচনা করেছেন গ্রন্থের পাতায় পাতায়।

বস্তুতঃ উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণীতে পাঠকালীন সময়ে শান্তিনিকেতন থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা এই গ্রন্থটির বিভিন্ন রচনাগুলির প্রধান আলোচ্য বিষয়। আমি আমার আলোচনায় বিষয়টিকে উপস্থাপন করার প্রচেষ্টা নিয়েছি।

গ্রন্থের মূল উপজীব্যঃ
আলোচ্য গ্রন্থটির মূল উপজীব্য বিষয় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত "শান্তিনিকেতন"। এই বিশ্বখ্যাত শিক্ষাকেন্দ্রে লেখক ডক্টর আশরাফ সিদ্দিকী তাঁর ছাত্র জীবন কেমন কাটিয়েছেন, তা বর্ণনা করেছেন বইয়ের পাতায় পাতায়। ১৯৪৫ সালের জুলাই মাসের ৩ তারিখে লেখক উপস্থিত হন শান্তিনিকেতনে। অসংখ্য পাখ-পাখালির ডাকে তিনি প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠতেন। আম-জাম, কাঠাল-লিচু, হরিতকী, শাল, শাতিম তলায় শায়ঘন পরিবেশে ক্লাশ করতেন। এক মুগ্ধ আবেমে সারাটা দিন কিভাবে কেটে যেত লেখক যেন তা বুঝতেই পারতেন না। শান্তিনিকেতনের প্রাকৃতিক পরিবেশ তথা রাস্তা, গাছ, পাখি, মানুষ, ছাত্র, শিক্ষক, ক্লাশ, অবারিত নৈসর্গিক দৃশ্য, গ্রাম, নদী ইত্যাদি নিয়েই সমৃদ্ধ হয়েছে লেখকের ছাত্রজীবন।

বইটির গুরুত্ব , তাৎপর্য ও প্রাসঙ্গিকতাঃ
বাংলা গ্রন্থ তালিকায় বইটির গুরুত্ব একটি বিশেষ প্রয়োজনীয় স্থান অধিকার করে আছে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত শান্তিনিকেতনের মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাঙালিরা আর একটিও তৈরি করতে পারেনি। এই বিদ্যানিকেতনের শিক্ষাদান পদ্ধতি, ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক, ছাত্র-ছাত্রী সম্পর্ক বাঙালি সংস্কৃতির চর্চা, প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা, অসাম্প্রদায়িক চেতনার চর্চা সবকিছুই ছিল অনন্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্যক্তিজীবনে যে উদার ও বৈশ্বিক মানবতার লালন নিজ জীবনে প্রয়োগ করেছেন, প্রাত্যাহিক জীবনাচারে মেনে চলতেন তার প্রতিফলন দেখি শান্তিনিকেতনের সামাজিক জীবনে।

এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা পাওয়া ছাত্র-ছাত্রীরা নিজেদের ব্যক্তিজীবনেও রবীন্দ্রনাথের আদর্শকে বহন করে চলতেন। এর সামগ্রিক রূপ জানা সম্ভব এই গ্রন্থটি পাঠের মাধ্যমে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেসব দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আদর্শ ও পরিচালনা পদ্ধতির সাথে পরিচিত হবার চেষ্টা করতেন। ফলে শিক্ষার আদর্শ ও লক্ষ্যের মূলভাব তিনি অনুভব করতে পেরেছেন। এছাড়াও প্রাচীন ভারতীয় আশ্রমের বৈশিষ্ট্য রবীন্দ্রভাবনায় সমুজ্জ্বল ছিল। ফলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত শান্তিনিকেতনে এক বৈশ্বিক আদর্শনিষ্ঠ শিক্ষাপদ্ধতির অভূতপূর্ব মিলন ঘটেছে। ফলে শান্তিনিকেতন হয়ে উঠেছে এক উন্নত রুচিশীল মানবাদর্শের তীর্থক্ষেত্র।

লেখক আশরাফ সিদ্দিকীর সমাজচেতনার বিনির্মাণ শান্তিনিকেতনের জল-আলো-বাতাসে সমৃদ্ধ হয়েছে। তিনি পুরাতন জীর্ণ-জ্বরা ত্যাগ করে এক সংস্কৃতির আলোকিত ভূবনে পরিভ্রমণ করেছেন। বুঝেছেন বাঙালি মর্মবাণীর সার্থকতার স্বরূপ।

প্রাসঙ্গিকতাঃ
বর্তমানকালের নতুন প্রজন্ম এক শিক্ষানীতিহীন শিক্ষাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে শিক্ষালাভ করে চলেছে। ফলে তারা শিক্ষার মর্মবাণী গ্রহণে সক্ষম হচ্ছে না। মৌলিক চিন্তা করতে পারা তো দূরের কথা, তাদের মধ্যে মানবীয় গুণগুলোর প্রতিফলন তেমনভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। বর্তমানকালের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ছাত্রদের সার্টিফিকেট প্রদানের বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সত্যিকারের মানুষ হবার গুণাবলী ছড়িয়ে দিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যর্থতা দিনে দিনে প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে।

বিপরীতে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত শান্তিনিকেতন একটি সম্পূর্ণ বিদ্যাশিক্ষার আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত। এখানে সমাজ ও সমকাল সম্পর্কিত বিষয়াদি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান আহরণের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা মানবীয় গুণাবলির চর্চা করতো। শিক্ষকদের কাছে মানবমন্ত্রে দীক্ষা নেবার সুযোগ পেত। শান্তিনিকেতনের শিক্ষার্থীরা তাদের ছাত্রত্বকালেই আদর্শ ও জ্ঞানের সম্মিলিত রূপ অনুধাবন করতে পারত। ছাত্রদের আত্মদর্শনের এই বিষয়টিই আলোচ্য গ্রন্থের মূল উপজীব্য।

শান্তিনিকেতনে প্রতিদিনের ক্লাশগুলো হত গাছের ছায়ায়। লেখক অন্য ছাত্রদের সাথে ঘাসের উপরে বসে শিক্ষকদের বক্তৃতা শুনতেন। একাসনে মেয়েরা বসলেও তাদের সম্পর্ক ছিল সহজাত বন্ধুভাবাপন্ন।
বর্ষাকাল এলেই শান্তিনিকেতনে হত 'বৃক্ষরোপন উৎসব'। বৃক্ষের প্রয়োজনীয়তা রবীন্দ্রনাথ তাঁর বিভিন্ন কবিতা, গল্প তথা সাহিত্য ও আলোচনায় একাধিকবার ব্যক্ত করেছেন। যার যথাযথ প্রতিফলন ঘটিয়েছেন নিজের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আঙ্গিনায়। প্রত্যেক ছাত্র-ছাত্রী নিজ হাতে শান্তিনিকেতনের মাটিতে কমপক্ষে একটি গাছ রোপন করতো নিজ হাতে। ফলে এক মায়ার বন্ধনে শান্তিনিকেতনের সাথে শিক্ষার্থীর গাঁটছড়া বাঁধা হয়ে যেত।

শান্তিনিকেতনে মাঝেমধ্যেই প্রখ্যাত কবি-সাহিত্যিক- গবেষকরা বেড়াতে আসতেন। শিক্ষার্থীরা তাঁদের সাথে সকলে মিলে সৌজন্য সাক্ষাৎকার বা আনন্দমিলন অনুষ্ঠানে মিলিত হত। আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিকভাবে মত বিনিময়ের মাঝে সাহিত্য বা গবেষণা জগতের নানারকম জ্ঞানের ভান্ডারের দেখা পেত। আশরাফ সিদ্দিকী দেখা পেয়েছেন এরকম বিখ্যাত ব্যক্তিত্বদের মধ্যে অন্যতম হলেন – ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়, কবি নরেন্দ্র দেব, ক্ষিতিমোহন সেন, সৈয়দ মুজতবা আলী, কবি জসীম উদদীন, সাগরময় ঘোষ প্রমুখ।

আশরাফ সিদ্দিকীর স্মৃতিচারণমূলক এই গ্রন্থের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হল তার শিক্ষকদের পাঠানো চিঠির বিষয়টি। শান্তিনিকেতনের শিক্ষক কিংবা অধ্যক্ষ সবার সাথে তাঁর চিঠির বিনিময় হত। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরও চিঠি বিনিময় বন্ধ হয়ে যায়নি। শান্তিনিকেতনের শিক্ষকরা ছাত্রদের সাথে মত বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে চিঠিকে খুব প্রাধান্য দিতেন।

লেখক তাঁর বইতে এরকম বেশ কিছু চিঠি প্রকাশ করেছেন। চিঠিগুলি পাঠ করে আমরা জানতে পারি শিক্ষকরা ছাত্রদেরকে কতটাই না ভালোবাসতেন, স্নেহ করতেন। ছাত্রদের ব্যক্তিজীবনের সুখ-দুঃখকে তারা নিজেদের জীবনে যেভাবে জড়িয়ে নিতেন, তা এই বই না পড়লে জানা হত না।

অসমাপ্ত

1 টি মন্তব্য:

নীল নক্ষত্র বলেছেন...

শান্তি নিকেতনে যাবার সৌভাগ্য হয়নি তবে এর শান্তির পরশ কিছুটা হলেও এখানে পাওয়া যাচ্ছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

 

About Me

আমার ফোটো
শিক্ষাজীবী। গ্রন্থপাঠ এবং ভ্রমণ আমার প্রিয় বিষয়।

শিশুদের বইয়ের ওয়েব সাইট

বইয়ের খোঁজ

আর্কাইভ

আমার অন্য ব্লগ

Creative Commons License