বৃহষ্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০০৯

শিক্ষা দিবসের ৪৭তম বার্ষিকী : অর্জনের সম্ভাবনাঃ নুরুল ইসলাম নাহিদ

আজ ১৭ সেপ্টেম্বর, শিক্ষা দিবস। পূর্ববর্তী বছরগুলোর শিক্ষা দিবসে কোন শিক্ষামন্ত্রী গণসচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কোন প্রবন্ধ লিখেছেন বলে আমার জানা নেই। বর্তমান সরকারের মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এর লেখা একটি প্রবন্ধ আজকের পত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। প্রবন্ধটির শিরোনাম: "শিক্ষা দিবসের ৪৭তম বার্ষিকী: অর্জনের সম্ভাবনা" আমি সম্পূর্ণ কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর লেখাটি আমার ব্লগে প্রকাশ করলাম।


শিক্ষা দিবসের ৪৭তম বার্ষিকী : অর্জনের সম্ভাবনা

নুরুল ইসলাম নাহিদ

বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলনের প্রতীক ১৭ সেপ্টেম্বর ঐতিহাসিক ‘শিক্ষা দিবস’। শিক্ষার জন্য সংগ্রাম ত্যাগ বিজয় গৌরব ও ঐতিহের প্রতীক এই শিক্ষা দিবসের এবার ৪৭তম বার্ষিকী। আজ থেকে ৪৭ তম বার্ষিকী। আজ থেকে ৪৭ বছর পূর্বে ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানে শাসকগোষ্ঠীর প্রতিভূ সামরিক শাসক জেনারেল আয়ুব খানের চাপিয়ে দেয়া গণবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল তথাকথিত জাতীয় শিক্ষানীতি বাতিল করে সকলের জন্য শিক্ষার অধিকার ও সুযোগ প্রতিষ্ঠা এবং একটি গণমুখী বিজ্ঞানমনস্ক অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সহজলভ্য আধুনিক শিক্ষানীতি ও শিক্ষা ব্যবস্থা অর্জনের লক্ষ্যে ছাত্র সমাজ অপ্রতিরোধ্য আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। ফেব্রুয়ারি মাস থেকে শুরু হওয়া সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের পটভূমিতে আয়ুবের শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে আগস্ট মাস থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘটসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ১৭ সেপ্টেম্বরের প্রস্ত্ততি গ্রহণ করা হয়। ছাত্র সমাজের মধ্যে ব্যাপক বিক্ষোভ ও আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্র সমাজের আন্দোলনের প্রতি সাধারণ জনগণের সহানুভূতি ও সমর্থন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে। সেই সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানেও প্রগতিশীল ছাত্র সমাজ ও জনগণেল মধ্যেও বিক্ষোভ এবং আন্দোলন প্রসারিত হতে থাকে।

১৯৫৯ সালে প্রেসিডেন্ট ও সামরিক শাসক আয়ুব খান তৎকালীন শিক্ষা সচিব এসএম শরিফকে চেয়ারম্যান করে ১১ সদস্যবিশিষ্ট ‘জাতীয় শিক্ষা কমিশন’ গঠন করেন। এই কমিশন পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর লক্ষ্য ও স্বার্থের প্রতিফলন ঘটিয়ে একটি গণবিরোধী শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে। ১৯৬২ সালের মাঝামাঝি সময়ে এই কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়। সঙ্গে সঙ্গে আয়ুব সরকার এই কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করে।

এই তথাকথিত ‘জাতীয় শিক্ষা নীতি’তে যে সকল বিষয় সুপারিশ করা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছেঃ শিক্ষাকে ব্যয় বহুল পণ্যের মতো শুধু উচ্চবিত্তের সন্তানদের স্বার্থে উচ্চশিক্ষাকে সীমিত করা এবং সাধারণের জন্য উচ্চ শিক্ষার সুযোগ একেবারেই সংকুচিত করে ফেলা। শিক্ষা ব্যয় পুঁজিবিনিয়োগ হিসেবে দেখে শিক্ষার্থীরা তা বহন করে, যে অভিভাবক বেশি বিনিয়োগ করবেন তিনি বেশি লাভবান হবেন; অবৈতনিক শিক্ষার ধারণাকে ‘অবাস্তব কল্পনা’ বলে উল্লেখ; ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে ডিগ্রি পর্যন্ত ইংরেজী পাঠ বাধ্যতামূলক; উর্দুকে জনগণের ভাষায় পরিণত করা; সাম্প্রদায়িকতাকে কৌশলে জিইয়ে রাখার চেষ্টা; ডিগ্রি কোর্সকে তিন বছর মেয়াদি করা, ইত্যাদি।

এই সকল বিষয় ছাত্র সমাজ এবং সচেতন মহলকে দারুণভাবে বিক্ষুব্ধ করে তুলে। এরই পরিণতিতে শিক্ষার দাবিতে ছাত্র সমাজের আন্দোলন ব্যাপক রূপলাভ করে এবং ১৭ সেপ্টেম্বরের অপ্রতিরোধ্য আন্দোলন আয়ুব সরকারকে বাধ্য করে ওই শিক্ষানীতি স্থগিত করতে। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারির পর সকল রাজনৈতিক দল ও কর্মকাণ্ড, ছাত্র সংগঠনসহ সব ধরনের সাংস্কৃতিক-সামাজিক সংগঠনের তৎপরতা বেআইনি করে সকল ধরনের মৌলিক মানবাধিকার ও ন্যায় বিচারের সুযোগ কেড়ে নেয়া হয়। চলে চরম দমননীতি। এরই মধ্যে ষাট সালের দিকে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন নেতারা গোপন সমঝোতা ও যোগাযোগ রেখে নিজ নিজ সংগঠন গোছানোর এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন গড়ে তোলার প্রচেষ্টা শুরু করেন। এভাবে ছাত্র সংগঠন দুটি ধীরে ধীরে সংগঠিত হতে থাকে এবং সাধারণ ছাত্রদের সঙ্গেও যোগাযোগ গড়ে তোলে।

তৎকালীন দুই বৃহৎ ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন এবং ডাকসু ও বিভিন্ন হল ও কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে সাধারণ ছাত্র সমাজের মতামতের প্রতিফলন ঘটিয়ে ছাত্র আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হয়। যার ফলে সকল আন্দোলন ও কর্মসূচির প্রতি সাধারণ ছাত্র সমাজের সমর্থন ও অংশগ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত।

একদিকে সামরিক শাসন বিরোধী গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন, অন্যদিকে চাপিয়ে দেয়া গণবিরোধী শিক্ষানীতি বাতিল এবং গণমুখী শিক্ষানীতি প্রতিষ্ঠার দাবিতে ব্যাপক বিক্ষোভে দেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এই পটভূমিতে বিভিন্ন কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় ১৭ সেপ্টেম্বর সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সারাদেশে হরতাল ঘোষণা করে। সামরিক শাসনের বিরম্নদ্ধে শিক্ষার দাবিতে ঐ হরতাল সারা দেশে অভূতপূর্ব সাফল্য এবং ছাত্র-জনতার ব্যাপক অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে আয়ুবের সামরিক শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দেয়। তখন সাধারণভাবে যে কোনো ধরনের আন্দোলন এমনকি ছাত্র সমাজের যে কোনো তৎপরতার ওপর ছিল সামরিক সরকার খগড় হস্ত। ১৯৬২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে সূচিত আন্দোলন দমন করার জন্য গ্রেফতার, মামলা, হয়রানি, নির্যাতন, এমনকি বেত্রদণ্ডসহ বর্বরোচিতভাবে নানা ধরনের শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। ১৭ সেপ্টেম্বর ছাত্র-জনতার ব্যাপক আন্দোলন ও হরতাল কর্মসূচি ঠেকানোর জন্য চরম নির্যাতনমূলক পথ গ্রহণ করা হয়। ওই দিন ঢাকাসহ দেশের সকল শহরের রাজপথে বিরাট বিক্ষোভ মিছিল চলতে থাকে। লাঠিচার্জ, টিয়ারগ্যাস প্রভৃতি তা দমন করতে পারেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল থেকে ছাত্রদের একটি বিক্ষুব্ধ মিছিল আব্দুল গনি রোড হয়ে অগ্রসর হয়ে পুলিশ পেছনে থেকে অতর্কিতে মিছিলের ওপর গুলিবর্ষণ করে। ঐদিন পুলিশের গুলিতে বাবুল, মোস্তফা, ওয়াজিউল্লাহ শহীদ হন। বহু ছাত্র-জনতা পুলিশ ও ইপিআর-এর নির্যাতন ও গুলিতে সারাদেশে আহত হন।

১৭ সেপ্টেম্বরের ঘটনা ছাত্র আন্দোলনকে আরো বেগবান করে তোলে। ছাত্র সমাজ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। সাধারণ জনগণ ছাত্র সমাজের প্রতি আরো দৃঢ় সমর্থন ব্যক্ত করেন। সারাদেশে তিন দিনব্যাপী শোকের কর্মসূচি ঘোষণা করে আন্দোলনের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখা হয়। ২৪ সেপ্টেম্বর পল্টন ময়দানে এক ছাত্র জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। জনগণের সমর্থিত ছাত্র সমাজের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন দমন করতে ব্যর্থ হয়ে আয়ুবের সামরিক সরকার তথাকথিত ‘শিক্ষা শিক্ষানীতি’ স্থগিত ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।

গণবিরোধী শিক্ষানীতির বিরম্নদ্ধে এবং একটি গণমুখী সার্বজনীন আধুনিক শিক্ষানীতির দাবিতে ঐতিহাসিক ১৭ সেপ্টেম্বর ছাত্র আন্দোলন ও শহীদদের আত্মদান তথা শিক্ষার ন্যায্য অধিকার ও সুযোগ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রতীক ১৭ সেপ্টেম্বরকে সেদিন ‘শিক্ষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে বিগত প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে বহু উত্থান-পতনের মধ্যেও প্রতি বছর এই দিনটি ছাত্র সমাজ এবং শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সকলেই শ্রদ্ধার সঙ্গে পালন করে আসছে। আজো শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে ১৭ সেপ্টেম্বর ‘শিক্ষা দিবস’ অম্লান হয়ে আছে। সেই লক্ষ্য অর্জনের সংগ্রাম আজো সম্পূর্ণ সফল হয়নি।

পাকিস্তানের শাসকশ্রেণী তাদের কায়েমী স্বার্থ এবং শাসন শোষণ স্থায়ী করার লক্ষ্যে শিক্ষাকে ব্যবহার করার জন্য ছিল দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। তারা চেয়েছিল শিক্ষানীতি ও শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে তাদের চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা আচ্ছন্ন করে রাখতে। তাই ছাত্র আন্দোলন ও ছাত্র জনতার ব্যাপক প্রতিরোধের যুগে তথাকথিত ‘জাতীয় শিক্ষানীতি’ স্থগিত ঘোষণা করলেও আয়ুব খানের সরকার বা শাসকশ্রেণী তাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে।

সরকার ১৯৬৪ সালে বিচারপতি হামুদুর রহমানের নেতৃত্বে আরেকটি কমিশন গঠন করে নতুন মোড়কে তাদের পরিকল্পিত শিক্ষানীতি ও ব্যবস্থা কায়েমের পথ গ্রহণ করে। বিভ্রান্তি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বিচারপতি হামুদুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত কমিশনের নাম দেয়া হয়েছিল 'Commission on Students' Problem and Welfare' বা ‘ছাত্র সমস্যা ও কল্যাণ কমিশন’ এই কমিশন দ্রম্নতই বছরের মাঝামাঝি তাদের রিপোট প্রণয়ন করে বাস্তবায়নের চেষ্টা শুরু করে। ‘হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট’ নামে পরিচিত এই রিপোর্ট বাস্তবায়নের জন্য বহু চেষ্টা ও কৌশল গ্রহণ করেও প্রবল ছাত্র আন্দোলনের মুখে পাকিস্তান সরকার তা বাস্তবায়নে সক্ষম হয়নি। এরপরও পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী হাল ছাড়েনি। উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের ফলে আয়ুব খানের ক্ষমতা ত্যাগ নিশ্চিত হলে জেনারেল ইয়াহিয়া খান সামরিক শাসক জারি করে ক্ষমতায় বসেই সীমিত সময়ে নির্বাচন করে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা প্রদানের ঘোষণা দিয়ে সর্বাগ্রে আবারও শিক্ষানীতি প্রণয়নে প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করে। সেই পুরনো লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করার জন্য নতুন প্রজন্মের ওপর তাদের চিন্তা-চেতনা চাপিয়ে দেয়া। দেশের সমগ্র সমাজ এই শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে তা প্রত্যাখান করে। কেবল পাকিস্তানী ভাবধারা ও শাসক শ্রেণীর অনুসারী জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘ (বর্তমান ইসলামী ছাত্র শিবির) ইয়াহিয়া খানের সামরিক সরকারের শিক্ষানীতির পক্ষে প্রকাশ্য অবস্থান গ্রহণ করে।

আমাদের গৌরবময় সকল সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ৩০ লাখ শহীদের জীবনের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরই প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানী ড. কুদরত-ই-কুদার নেতৃত্বে গঠিত শিক্ষা কমিশন স্বাধীন দেশের উপযোগী একটি আধুনিক গণমুখী শিক্ষানীতি প্রণয়ন করলেও ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পর পরিস্থিতির পরিবর্তনের ফলে তা বাস্তবায়িত হয়নি। এরপর প্রায় অর্ধডজন শিক্ষানীতি প্রণীত হলেও দুর্ভাগ্যক্রমে আজো স্বাধীন দেশে একটি যুগোপযোগী শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

এবারের শিক্ষা দিবস এক নতুন সম্ভাবনাময় পরিস্থিতিতে উদযাপিত হচ্ছে। বিগত ২৯ ডিসেম্বর ২০০৮ জাতীয় সংসদের নির্বাচনে জনগণের অভূতপর্ব রায়ের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ তথা মহাজোট সরকার গঠনের ফলে ঐতিহাসিক শিক্ষা দিবসের মূল লক্ষ্য এবং জাতির আকাঙক্ষা বাস্তবায়নের এক বিরাট সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। এই সম্ভাবনাকে আজ বাস্তবায়িত করেই শিক্ষা দিবস’ এবং শিক্ষার জন্য আন্দোলনের সকল শহীদের স্বপ্ন সফল করে তোলা সম্ভব।

আমাদের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য আদর্শ ও চেতনা এবং ৩০ লাখ শহীদের স্বপ্ন তথা শেখ হাসিনার ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ এবং বঙ্গবন্ধুর ‘সোনার বাংলা’ অর্থাৎ দারিদ্র্য, ক্ষুধা, নিরক্ষরতা, দুর্নীতি, পশ্চাদপদতার অবসান ঘটিয়ে আধুনিক উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য সামনে রেখে বাষট্টির ঐতিহাসিক শিক্ষানীতির আন্দোলনের ৪৭ বছর পর নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। আমাদের অতীতের শিক্ষার সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় এ বছর শেষ হওয়ার পূর্বেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নতুন শিক্ষানীতি চূড়ান্ত করতে আমরা বদ্ধ পরিকর। খসড়া শিক্ষানীতি নিয়ে এই মুহূর্তে আমি এখানে কোন মন্তব্য না করাই সমিচীন মনে করছি। আমরা খসড়া শিক্ষানীতি সকলের মতামত গ্রহণের জন্য ওয়েব সাইটে দিয়েছি। আমরা সকলের মতামত নিয়েই তা চূড়ান্ত করতে চাই। (www.moedu.gov.bd)

শিক্ষা কোন দলীয়, গোষ্ঠীগত, আঞ্চলিক বা সাম্প্রদায়িক বিষয় নয়। শিক্ষা সমগ্র জাতির ভবিষ্যৎ এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকারের বিষয়। আমরা আশা করব দেশের সকল শিক্ষা সংশ্লিষ্ট মানুষ এবং দলমত নির্বিশেষে সাধারণ জনগণ তাদের সুচিন্তিত মতামত ও পরামর্শ দিয়ে প্রস্তাবিত খসড়া শিক্ষানীতিকে চূড়ান্ত করার কাজে এগিয়ে আসবেন।

আসুন আমাদের শিক্ষার জন্য ঐতিহাসিক আন্দোলনের ৪৭তম বার্ষিকীতে শিক্ষক, ছাত্র, শিক্ষাবিদ, তথা শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সকল মহল এবং সকল শ্রেণীর মানুষ তাদের মতামত ও পরামর্শ দিয়ে ১৯৬২ সালে একটি গণমুখী শিক্ষানীতি ও ব্যবস্থার লক্ষ্য অর্জনের সংগ্রামের শহীদদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করি।

আমাদের শিক্ষার অধিকার এবং গণমুখী বিজ্ঞানভিত্তিক, অসাম্প্রদায়িক, যুগোপযোগী প্রগতিশীল একটি শিক্ষানীতির জন্য প্রায় অর্ধশতাধিক ধরে যে সংগ্রাম অব্যাহতভাবে চলমান তারই সফল পরিণতি হলো এবারের শিক্ষানীতি। এই শিক্ষানীতির চূড়ান্ত করণ এবং বাস্তবায়ন সকলের কাছে সবিনয় আহ্বান_ আপনাদের সকলের সাহায্য-সহযোগিতা এবং ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্ঠাই হবে এর সাফল্যের আসল শক্তি।

আমাদের সকল শহীদ এবং জনগণের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা থেকেই তা করে যেতে হবে।

[লেখক : সংসদ সদস্য ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষামন্ত্রী]

(বানানজনিত কিছু যান্ত্রিকত্রুটি সংশোধন করা হয়েছে। পুনঃপ্রকাশের উপর কোন রকম বিধিনিষেধ থাকলে এই পোস্টটি মুছে ফেলা হবে।)
সংগ্রহ করা হয়েছে ইত্তেফাক পত্রিকা থেকে।
বিস্তারিত পড়ুন....

বৃহষ্পতিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০০৮

নিউইয়র্ক টাইমস এর মতে ২০০৮ সালের সেরা ১০ গ্রন্থ


নিউইয়র্ক টাইমস তাদের দৃষ্টিতে সেরা ১০টি গ্রন্থের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। তালিকায় ফিকশন ও ননফিকশন দুইটি ক্যাটাগরিতে ৫টি করে গ্রন্থ রাখা হয়েছে। তালিকাটি নিম্নরূপঃ-

FICTION

DANGEROUS LAUGHTER
Thirteen Stories
By Steven Millhauser.

A MERCY
By Toni Morrison.

NETHERLAND
By Joseph O’Neill.

2666
By Roberto Bolaño. Translated by Natasha Wimmer.

UNACCUSTOMED EARTH
By Jhumpa Lahiri.


NONFICTION

THE DARK SIDE
The Inside Story of How the War on Terror Turned Into a War on American Ideals
By Jane Mayer.

THE FOREVER WAR
By Dexter Filkins.

NOTHING TO BE FRIGHTENED OF
By Julian Barnes.

THIS REPUBLIC OF SUFFERING
Death and the American Civil War
By Drew Gilpin Faust.

THE WORLD IS WHAT IT IS
The Authorized Biography of V. S. Naipaul
By Patrick French.

গ্রন্থগুলো ২০০৮ সালের উল্লেখযোগ্য ১০০টি গ্রন্থের এক তালিকা থেকে বাছাই করা হয়েছে। তালিকার দুই একটা গ্রন্থ পড়তে পারলে ভালো লাগতো। কিন্তু পড়া আর হয়ে উঠবে কি? ঢাকা ছাড়া কি আর এসব গ্রন্থ পাওয়া যাবে? আর মূল্য নিশ্চয় সামর্থ্যের চাইতে অনেক অনেক বেশি হবে।
বিস্তারিত পড়ুন....

রবিবার, ২৩ নভেম্বর, ২০০৮

সংস্কৃতি প্রত্যয়টি আমরা কি করে পেলাম

অনুঘটক পত্রিকার আর একটি উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ হলো আবুল কাসেম ফজলুল হক এর লেখা 'সংস্কৃতি আমাদের হারানো প্রত্যয়'। সংস্কৃতি কি, সংস্কৃতি বলতে কি বোঝায়, বাংলা ভাষায় সংস্কৃতি বিষয়ক অনুধাবন কবে থেকে কিভাবে শুরু হলো, সংস্কৃতি বলতে আমরা বর্তমানে কি বুঝছি, আর সংস্কৃতি বলতে সত্যিকারের কোন বিষয়টাকে বোঝায় ইত্যাদি বিষয়গুলোর আলোচনা রয়েছে এই প্রবন্ধটিতে।

জানা যায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মাধ্যমে বাংলাভাষায় সংস্কৃতি বিষয়ক ধারণার প্রথম প্রবর্তন ঘটে। ম্যাথু আর্নল্ডের (১৮২২-১৮৮৮) Culture and Anarchy বইটি পড়ে তিনি ইউরোপিয় কালচারের ধারণার সাথে পরিচিত হন। নতুন উপলব্ধিবোধে অনুপ্রাণিত বঙ্কিমচন্দ্র নিজেদের সংস্কৃতিবোধকে পুনর্গঠনের প্রেরণা অনুভব করেন। তাঁর আগে বাংলাভাষায় রচিত কোনকিছুতে সংস্কৃতি নিয়ে কারও ভাবনাচিন্তার কোন খোঁজ পাওয়া যায় নি। বঙ্কিমচন্দ্র ম্যাথু আর্নল্ডের পাশাপাশি বেন্থাম, স্টুয়ার্ট মিল, ডারউইন, স্পেন্সার, কোঁৎসহ বিভিন্ন ইউরোপিয় মনীষীর কাছ থেকে সাংস্কৃতিক চেতনার সাথে পরিচিত হয়েছিলেন। আবুল কাসেম বলেছেন:
তবে কালচার বিষয়ক ধারণার কোনো উপাদানই যে আগে বাংলা ভাষায় ছিল না, তা নয়। রামপ্রসাদের গানে আছে: 'এমন মানবজমিন রইল পতিত/ আবাদ করলে ফলত সোনা'। এখানে জীবনের যে আবাদের কথা বলা হয়ে তাকে কালচার বলা যায়। ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ, বানপ্রস্থ, সন্ন্যাস, সংযম, চিত্তশুদ্ধি, চিৎপ্রকর্ষ, সভ্যতা, সম্প্রীতি প্রেমধর্ম ইত্যাদি কথার মধ্যেও কালচারের ধারণা আছে।


উনিশ শতকের বাংলায় ইউরোপিয় দার্শনিকদের মধ্যে স্টুয়ার্ট মিল, অগাস্ট কোঁৎ ও চার্লস ডারউইনের প্রভাব সবচাইতে বেশি ছিল। বঙ্কিমচন্দ্র ম্যাথু আর্নল্ডের সুরে সুর মিলিয়ে বলেছেন: '"যে শিশু দেখিতেছে, ইহা মনুষ্যের অঙ্কুর। বিহিত কর্ষণে অর্থাৎ অনুশীলনে উহা প্রকৃত মনুষত্ব প্রাপ্ত হইবে।" বঙ্কিমচন্দ্র যখন সংস্কৃতি বিষয়টিকে অনুধাবন করার চেষ্টা করছিলেন, সে সময়ে বাংলাভাষায় আর কারও মধ্যে এ সম্পর্কিত কোনরূপ সচেতনতা লক্ষ্য করা যায় না। তাই বলা যায়, বাঙালিদের মধ্যে উনিশ শতকের শেষাংশর বঙ্কিমচন্দ্র থেকে সংস্কৃতি সম্পর্কে চিন্তার সূত্রপাত।
বঙ্কিম অনুভব করেছিলেন যে, কালচার ধর্মের মতোই একটি গুরুতর ব্যাপার, তবে ধর্ম থেকে ভিন্ন। ম্যাথু আর্নল্ড লিখেছেন: The substance of religion is culture. বঙ্কিমচন্দ্র এর অনুসরণে লিখেছেন : 'মানববৃত্তির উৎকর্ষণেই ধর্ম।' এর ষাট বছর পরে মোতাহার হোসেন চৌধুরী লিখেছেন: "ধর্ম সাধারণ লোকের কালচার, আর কালচার শিক্ষিত, মার্জিত লোকের ধর্ম।"........ অনুশীলন (রচনাবলীতে ধর্মতত্ত্ব) গ্রন্থে বঙ্কিচন্দ্র মানুষের মনুষ্যত্ব অর্জনের সমস্যা, সম্ভাবনা ও উপায় আলোচনা করেছেন। তবে তাঁর চিন্তা কেবল ব্যক্তিকে নিয়ে নয়, ব্যক্তির সঙ্গে সমাজকে নিয়েও। ব্যক্তি তাঁর দৃষ্টিতে সমাজের অংশ। মানুষের সৃষ্টি সামর্থ্য ও তার সদ্ব্যবহার নিয়েও তিনি চিন্তা করেছেন। নীতিবিজ্ঞানের বিচারে বঙ্কিম উপযোগবাদী বা পরিতৃপ্তিবাদী (Utilitarianist), আত্মনিগ্রহবাদী (Austerist) নন।
প্রথমদিকে ১৮৮৮ সালে ধর্মের ধারণার সঙ্গে কালচারের ধারণার মিশ্রণ ঘটিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র অনুশীলন নামে একটি বই লিখেছিলেন। পরে বঙ্কিম রচনাবলীতে এই বইটি 'ধর্মতত্ত্ব' নামে সঙ্কলিত হয়। আবুল কাশেম মনে করেন:
অনুশীলন বাংলা ভাষার এক অসাধারণ গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী গ্রন্থ। বাংলা ভাষার দেশে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এতে কেবল যে ব্যক্তিগত জীবনের কালচারের কথাই বলা হয়েছে, তা নয়; সামাজিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কালচারের কথাও এতে আছে। কালচার বা অনুশীলন ব্যাটারটা যে সৃষ্টিশীল, তাও বলা হয়েছে। এ গ্রন্থ আজকের দিনে বাংলাদেশের বাঙালিদের জন্য যেমন, পশ্চিম বাংলার বাঙালিদের জন্যও তেমনি- গুরুত্বপূর্ণ ও প্রেরণাদায়ক। আজো এ গ্রন্থ আমাদেরকে ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে জীবনজগত সম্পর্কে নতুন করে চিন্তা করতে প্রাণিত করে।
উনিশ শতকের শেষে এবং বিশ শতকের প্রথমদিকে অনুশীলন শব্দটাকে 'কালচার' শব্দের সমার্থশব্দ হিসেবে বহুলভাবে ব্যবহার করা হচ্ছিল। যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি 'কৃষ্টি' শব্দকে কালচারের সমার্থক হিসেবে প্রবর্তনের চেষ্টা চালান। ১৯২০ এর দশকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের সহায়তায় সংস্কৃতি শব্দটিকে প্রচার করেন। প্রমথনাথ বিশীও এই প্রচেষ্টার অন্যতম অংশীদার ছিলেন। সে সময়ে এই 'কালচার' শব্দের যথাযথ বাংলা শব্দ কি হতে পারে সে নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক হয়েছিল। 'কর্ষণ', 'চর্চা', 'শিক্ষা', 'বৈদগ্ধ্য', 'চরিত্র', ইত্যাদি শব্দকে প্রস্তাব করা হয়েছিল। এই শব্দগুলোর মধ্যে বিভিন্ন অর্থবোধক পার্থক্যর পাশাপাশি পরস্পরের মধ্যে মর্মগত ধারণারও বেশ পার্থক্য ছিল। পরবর্তীতে পাকিস্তান আমলে তমদ্দুন মজলিশ 'সংস্কৃতি' শব্দের পরিবর্তে 'তমদ্দুন' বা 'তাহজিব' শব্দদ্বয় প্রচলনের একটি প্রচেষ্টাও হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত টিকে গেছে সংস্কৃতি শব্দটি। তাহলেও কি হবে। প্রথমদিকে বঙ্কিচন্দ্র কালচার শব্দের মধ্যে যে বিশাল ধারণার সমাবেশ ঘটিয়েছিলেন কালক্রমে সে ধারণার বিলুপ্তি ঘটেছে। এখন সংস্কৃতি শব্দের ভাবার্থ আর ব্যাপক কোন ধারণাকে বহন করে না, বরং
অনেকাংশে সংকুচিত/ সঙ্কীর্ণ হয়ে গেছে।
ব্রিটেনে বেকন (১৫৬১-১৬২৬) থেকে, আমেরিকায় ইমার্সন (১৮০৩-১৮৮৩) থেকে এবং ইউরোপের অন্যান্য ভাষায় বেকনের কাছাকাছি সময় থেকে কালচারের ধারণার ধারাবাহিক বিকাশ লক্ষ্য করা যায়। বঙ্কিমের পরে ক্রমে ধারণাটি পৃথিবীর দক্ষিণাঞ্চলে বিস্তৃত হয়। বঙ্কিম থেকে পরবর্তী কালের বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ চিন্তকেরা প্রত্যেকেই কালচার বা সংস্কৃতি সম্পর্কে চিন্তা করেছেন। তবে বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ চিন্তকেরা কালচার বা সংস্কৃতির ধারণাকে যেভাবে বিকশিত করেছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রচারমাধ্যম ধারণাটিকে তা থেকে বিচ্যুত করে অর্থের দিক দিয়ে একেবারে সঙ্কীর্ণ করে ফেলেছে। আজকের প্রচারমাধ্যম সংস্কৃতি বলতে বোঝায় নাচগান, আবৃত্তি, নাটক ইত্যাদি বিনোদনমূলক বিষয়কে। সংস্কৃতি ও বিনোদন এখন সমার্থক হয়ে পড়েছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের বিদ্বৎসমাজও আজ ঔৎসুক্যহীন।
আমাদের দেশে সংস্কৃতি বিষয়ে যা হয়েছে তা পৃথিবীর ইতিহাসের বিপরীত পথে হেঁটেছে। পৃথিবীর অন্যান্য ভাষায় সংস্কৃতির ধারণাটি ক্রমশ বিকাশমান, কিন্তু আমাদের দেশে এই ধারণাটি ক্রমাগত সংকুচিত হয়ে চলেছে। বাংলা ভাষায় সংস্কৃতি নিয়ে বেশ কিছু অসাধারণ চিন্তাপ্রদায়ী গ্রন্থ রচনা হয়েছে। যেমন: 'অনুশীলন: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়', 'সংস্কৃতির রূপান্তর: গোপাল হালদার', 'কৃষ্টি কালচার সংস্কৃতি: নীহাররঞ্জন রায়' ইত্যাদি। সংস্কৃতি নিয়ে রবীন্দ্রনাথ, যোগেশচন্দ্র প্রমুখের ভাবনাগুলো রয়েছে তাদের বিভিন্ন প্রবন্ধে। এছাড়াও গত পঞ্চাশ বৎসরে আবুল মনসুর আহমদ, আবুল ফজল, আহমদ শরীফ, বদরুদ্দীন উমর, আব্দুল মতীন, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, যতীন সরকার এবং আরও অনেক প্রাজ্ঞ চিন্তক সংস্কৃতি নিয়ে তাদের ধারণা ও উপলব্ধি প্রকাশ করেছেন। পশ্চিম বাংলায় অন্নদাশঙ্কর রায়, নারায়ণ চৌধুরী, শিবনারায়ণ রায়, অম্লান দত্ত ও আরো অনেকে সংস্কৃতির স্বরূপ অন্বেষণে নিজস্ব মতামত প্রচার করেছেন। বস্তুত: গত সোয়াশো বৎসর ধরে বাংলাভাষার পণ্ডিতেরা সংস্কৃতিকে যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করার নিরন্তর প্রয়াস পেয়েছেন। আজকের দিনে সংস্কৃতিকে বুঝতে হবে এদের দেখিয়ে দেয়া পথ ধরেই। তাদের চিন্তার ধারাবাহিকতায় সংস্কৃতিকে অনুভব করতে হবে। এ প্রসঙ্গে লেখক বলেন:
সংস্কৃতির ধারণা সংস্কার এর ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। সংস্কার বলতে বোঝায় শুদ্ধিকরণ, পরিশোধন, সংশোধন, উৎকর্ষসাধন, উন্নতিবিধান, সৌন্দর্যবিধান ইত্যাদি। সংস্কৃতি মানে জীবন ও সমাজের শুদ্ধিকরণ, পরিশোধান, উৎকর্ষসাধন, উনইতবিধান, সৌন্দর্যবিধান। ইংরেজি Culture এর সম্পর্ক আছে Cultivation এর সঙ্গে। এই দুটি শব্দের অর্থও সংস্কৃতি আর সংস্কার এর অর্থের মত। জার্মান Culture শব্দও একই ধরণের অর্থ বহন করে। কৃষ্টি শব্দটিও একই অর্থের বাহক। কৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্ক আছে কৃষির বা চাষাবাদের।
এজন্য বলা হয় মানুষই সংস্কৃতির বাহক ও সাধক। শুধুমাত্র মানুষই পারে নিজের ও নিজের চারপাশের সংস্কার সাধন করতে। মানুষ ক্রমাগত তার পরিবেশের পরিবর্তন ঘটাতে চায়। চায় বিনির্মাণ করতে, পরিশীলিত করতে। তাই সাংস্কৃতিক অধিকার একমাত্র মানুষের রয়েছে, অন্য প্রাণীর নেই। মানুষ যতদিন পর্যন্ত বিবর্তনপ্রক্রিয়ার এক পর্যায়ে এসে নিজস্ব সাস্কৃতিক পরিচয় তৈরি করতে পারেনি, ততদিন পর্যন্ত অন্যপ্রাণীর সাথে তার পার্থক্য
ততোটা পরিলক্ষিত হত না। ব্যক্তিগত ও যৌথ প্রয়াস মানুষের জীবন ও পরিবেশের যে উৎকর্ষ সাধন করেছে, তার গতি নির্ধারিত হয়েছে মানুষের নিজের ইচ্ছায়। মানুষ যেভাবে নিজের জীবনকে তথা তার পরিবেশকে সমৃদ্ধ করতে চায় তাই তার সংস্কৃতি। ব্যক্তিগত আচরণ, জীবনযাত্রা, মনোভঙ্গি, আদর্শবোধ ইত্যাদির মধ্যে তার সাংস্কৃতিক উপলব্ধি ও প্রচেষ্টা নিহিত থাকে। শুধুমাত্র ব্যক্তিজীবন নয়, সাংস্কৃতিক চেতনা রয়েছে সামাজিক, জাতীয়, রাষ্ট্রীয় জীবনেও।
দর্শন, বিজ্ঞান ও শিল্পকলা সৃষ্টি মধ্য দিয়ে আর উন্নতিশীল রাষ্ট্রব্যবস্থা, সমাজব্যবস্থা ও জীবনপদ্ধতি প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে মানুষ তার সাংস্কৃতিক সামর্থ্যের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে।.... সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কে সম্পর্ক আছে রুচি, পছন্দ, দৃষ্টি, শ্রুতি, চিন্তাশক্তি, শ্রমশক্তি, সমাজবোধ, বিবেক-বুদ্ধি, আহার্য, ব্যবহার্য, পরিপার্শ্ব, আশা-আকাঙ্ক্ষা, বিচারক্ষমতা, গ্রহণ-বর্জন ও প্রয়াস-প্রচেষ্টার। সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে ব্যক্তির ও যূথের কর্মেন্দ্রিয়, জ্ঞানেন্দ্রিয়, আন্তরিন্দ্রিয় ও পরিবেশের সংস্কার, রূপান্তর ও নবজন্ম ঘটে। কোনো ব্যক্তির কিংবা জনগোষ্ঠীর উৎপাদনসামর্থ্য, সৃষ্টির সামর্থ্য, ন্যায়নিষ্ঠা, কল্যাণচেতনা, সত্যপ্রিয়তা, সৌন্দর্যবুদ্ধি এবং উন্নত ভবিষ্যত সৃষ্টির চিন্তা ও চেষ্টা ইত্যাদির মধ্য দিয়ে সেই ব্যক্তির কিংবা জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে।
কিন্তু আমরা যারা সাধারণ মানুষ তাদের একটি সহজ প্রবণতা হল সংস্কৃতির সংজ্ঞার সংকোচন ঘটানো। আমরা ব্যক্তিজীবনের চিন্তা-ভাবনা, আদর্শ, রুচি, দর্শনগত কোন পরিশীলন না করেই শুধুমাত্র গান-বাজনা অর্থাৎ বিনোদনচর্চাকে সংস্কৃতির
পরাকাষ্ঠা বলে গণ্য করি। আমরা মনে করি দুলাইন সঙ্গীত পরিবেশন করতে পারা বা নাটকে অভিনয় অর্থাৎ মঞ্চে নিজেকে প্রদর্শন করতে পারলেই সংস্কৃতির পরাকাষ্ঠা প্রকাশ করা হলো। এ সম্পর্কে স্পষ্ট ভাষায় আবুল কাশেম ফজলুল হক বলেছেন:
কেবল নাচ, গান, আবৃত্তি, নাটক, বিনোদন ইত্যাদিকেই সংস্কৃতি মনে করা ভুল। মানুষের সকল চিন্তা ও কর্ম এবং উৎপাদন ও সৃষ্টিই তার সংস্কৃতির বাহন। নাচ, গান, আবৃত্তি ও নাটকও সংস্কৃতির অন্যতম বাহন মাত্র, সংস্কৃতি নয়। সঙ্গীতানুষ্ঠান, নাট্যানুষ্ঠান, নৃত্যানুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক উৎসব (Cultural festival), সাংস্কৃতিক দল (Cultural troop) ইত্যাদি কথার মধ্য দিয়ে সংস্কৃতির যে রূপ পকাশ পায় তা অনুভূতি-নির্ভর ভাসাভাসা আংশিক রূপ মাত্র- সমগ্র রূপ নয়। নাচ-গান ও শিল্প সাহিত্যের মধ্য দিয়ে যেমন, তেমনি দর্শন-বিজ্ঞান-ইতিহাস, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক চিন্তা ও চেষ্টা এবং ব্যক্তিগত-পারিবারিক-সামাজিক জীবনের সকল চিন্তাভাবনা ও কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়েই প্রকাশ পায় ব্যক্তির ও সমষ্টির সংস্কৃতি। আত্মশক্তিকে সংগঠিত কর, বিদেশের ও অতীতের জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে প্রকৃতির রহস্য উদঘাটন করে ইতিহাসের গতি নির্ধারণের চিন্তা ও চেষ্টা আর ন্যায়-অন্যায়, কল্যাণ-অকল্যাণ, কর্তব্য-অকর্তব্য ও সুন্দর-কুৎসিত ইত্যাদি বিচার করে ন্যায়, কল্যাণ, কর্তব্য ও সুন্দরকে অবলম্বন করে জীবন-যাপনের চিন্তা ও চেষ্টা ইত্যাদির মধ্যেই ব্যক্তির ও সমষ্টির সংস্কৃতিমানতা নিহিত থাকে। বলাই বাহুল্য, কোনো জাতির সংস্কৃতির অভিব্যক্তি ঘটে সেই জাতির কৃতি ও কীর্তির মধ্যেই।
একটি মাত্র প্রবন্ধে সংস্কৃতির সম্পূর্ণকে প্রকাশ করা সত্যিই কঠিন। সংস্কৃতির যথার্থ সংজ্ঞাকে কোন বর্ণনা দিয়ে নয়, অনুভূতি দিয়ে উপলব্ধি করতে হয়। কোন ব্যক্তিবিশেষের সংস্কৃতি যেমন তার সত্যিকার পরিচয়কে উদঘাটন করে, তেমনি জাতীয় সংস্কৃতি প্রকাশ করে জাতিগত মূল্যমানকে। আমরা জাতি হিসেবে কেমন তার পরিচয় লুকায়িত থাকে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিতে। বিদেশী সংস্কৃতি, দেশীয় সংস্কৃতি ইত্যাদি ধুয়া তুলে এর সমাধান সম্ভব নয়। নিজের পরিচয় কোথায় লুকিয়ে আছে, তা বুঝতে হবে নিজেকেই। আর সেই মাপে পরিশীলিত করতে হবে নিজেকে। এই আত্মপোলব্ধির অভাবে তৈরি হয় অন্তঃসারশূন্যতা। আলোচ্য প্রবন্ধে লেখক আবুল কাশেম ফজলুল হক সংস্কৃতির এই সামগ্রিক ধারণাটিকে সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করেছেন। দিগন্তের এক বিন্দুবৎ প্রতিবিম্ব ফুটিয়ে তুলেছেন।
বিস্তারিত পড়ুন....

বুধবার, ১৯ নভেম্বর, ২০০৮

জয়নুল আবেদিনের শিল্পাচার্য হয়ে ওঠা

আগের পোস্টটিতে আমরা অনুঘটক পত্রিকার সাথে আংশিক পরিচিত হয়েছিলাম। আজ এই পত্রিকার একটি ভালোলাগা প্রবন্ধের কথা বলতে চাই। বলছিলাম গুরু আমার অমর গুরু প্রবন্ধের কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের অধ্যাপক মতলুব আলী শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন কিভাবে শিল্পাচার্য হয়ে উঠলেন সে সম্পর্কে লিখেছেন। বাংলাদেশের চিত্রকলার ইতিহাসে জয়নুল আবেদীন ছিলেন একজন পথপ্রদর্শক। কিন্তু শুধুমাত্র পথপ্রদর্শন করেই তিনি দায়িত্বমুক্ত হননি। নিজের ঘাড়ে তুলে নিয়েছেন চিত্রকলা শিক্ষার ভার। দেশভাগের কিছুদিন পর জয়নুল আবেদীন তাঁর মাতৃভূমি বাংলাদেশে চলে আসেন। তিনি চিত্রকলার প্রতি সম্পূর্ণভাবে আত্মনিমগ্ন ছিলেন। তাই এই জগৎ ছেড়ে অন্য কিছু করার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারতেন না। ঢাকায় এসে তিনি কয়েকদিনের মধ্যে একটি আর্টকলেজ প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ নেন। মাত্র ১৮ জন শিক্ষার্থী নিয়ে শুরু করা সেই আর্ট কলেজ আজ মহীরূহতে পরিণত হয়েছে। তিনি কমনওয়েলথ বৃত্তি পেয়ে পঞ্চাশের দশকের শুরুতে ইংল্যাণ্ডে গিয়ে তিনি লন্ডনের স্লেড স্কুল অব আর্ট এর ছাত্রত্ব গ্রহণ করেন। ছাপা ছবি ও চিত্রশিল্পে উচ্চশিক্ষা অর্জন করেন। অবশ্য তার আগেই তিনি তার শিল্পসামর্থ্যের যথেষ্ঠ প্রমাণ রাখতে পেরেছিলেন। মতলুব আলী'র ভাষায়-
"পাশ্চাত্যে অবস্থানকালে এবং তৎপরবর্তীকলেও যখন তিনি স্বদেশে অবস্থান করছেন, এঁকেছেন এমন অনেক চিত্র যা একদিকে বিষয়-উপজীব্য ও রূপ-বৈশিষ্ট্যে স্বদেশানুগ হয়েও গড়ন-গঠন ও প্রকাশশৈলীতে পাশ্চাত্যের শিল্পাদর্শের অনুকূল অতি উন্নত মানসম্পন্ন সৃজনশিল্পের প্রমাণ। সেদিক থেকে এদেশের নিরীক্ষাধর্মী আধুনিক চিত্রশিল্প শাখারও তিনি পথ-প্রদর্শক; কারণ শুরুটা গুরু-আবেদিনের মাধ্যমে শুধু সম্পাদিত হয়েছিলো বললে ভুলই হবে, আসলে তাঁর ওই সমস্ত ছবি (যেমন 'পাইন্যার মা'), 'গুণটানা', 'রমণী-১', 'চিন্তা', 'স্নানশেষে', 'কলসী কাঁখে' ও 'কৃষক' প্রভৃতি একটা শক্তিসম্পন্ন শিল্পকর্মের স্ট্যান্ডার্ড উপস্থাপিত করেছিলো পরবর্তী প্রজন্মের চারুশিল্পকর্মীদের জন্য।....... জয়নুল আবেদীন চেয়েছিলেন মাতৃভূমিতে চারুশিল্পীদের অংশগ্রহণ ও কর্মশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে একটি উন্নত শিল্পীসমাজ গড়ে উঠুক। শিল্পীরা ছবি আঁকবে, শিল্পচর্চা করবে আর তার মাধ্যমেই এমন সুন্দর এক পরিবেশ তারা সৃষ্টি করবে যা এদেশের শিল্পকলা ও সংস্কৃতির বিকাশ-অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।"


আর্ট কলেজের শিক্ষক জয়নুল আবেদীন কিভাবে শিল্পাচার্য হয়ে উঠলেন তার কাহিনী মতলুব আলী স্পষ্ট ভাষায় প্রকাশ করেছেন তাঁর 'আমাদের জয়নুল' (১৯৮৫) গ্রন্থভুক্ত 'শিল্পী থেকে শিল্পাচার্য' অধ্যায়ে। একথা তিনি নিজেই প্রবন্ধের শুরুতে উল্লেখ করেছেন। বিস্তারিত উদ্ধৃত করছি:-
'একদিন আর্ট কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা ঠিক করলো যে, তারা তাদের প্রাণপ্রিয় শিক্ষক প্রতিষ্ঠাতা-অধ্যক্ষ জয়নুল আবেদিনের নামের মাধ্যমে সে বছরের বার্ষিক প্রদর্শনীর উদ্বোধন করবে। তাই করাও হলো- তার সম্মানে কয়েকটি ছত্র কবিতার মতো লিখে, তার শেষে "জয়নুল আবেদিনকে আমরা স্মরণ করছি এই শুভ উদ্বোধনে" এই কথাগুলি প্রদর্শনী উপলক্ষে প্রকাশিত ছোট্ট পুস্তিকার প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপিয়ে দর্শকদের বিতরণ করে তারা প্রদর্শনীর দরজা খুলে দিলো। আর ওই লেখাটায় তাঁর নামের সামনে ছাত্ররা বুদ্ধি করে জুড়ে দিয়েছে নতুন একটি সম্মানজনক শব্দ: "শিল্পাচার্য"। তা অতিথি-দর্শকদের উদ্দেশে মাইকেও ঘোষণা করা হলো। 'আচার্য' অর্থ হচ্ছে শিক্ষক বা শিক্ষার গুরু, 'শিল্প' শব্দের সাথে আচার্য যোগ করে হলো 'শিল্পাচার্য'। আর জয়নুলতো শিল্প-শিক্ষা বা ছবি আঁকা শিক্ষার গুরুই। এখন 'শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন' এই নাম ছড়িয়ে পড়লো মুখে মুখে, ছাপানো হলো পত্র-পত্রিকায়। শেষটায় এমন হলো যে, শিল্পাচার্য বলতেই আমরা বুঝলাম জয়নুলের নাম।'
কিন্তু জয়নুল আবেদীনকে এত শুধুমাত্র ছাতদের দ্বারা সম্মানিত করার প্রয়োজন পড়লো কেন? স্বাভাবিক চিন্তায় এরূপ ভাবনা আসতেই পারে। তার উত্তরও রয়েছে আলোচ্য প্রবন্ধটিতে। মতলুব আলীর ভাষায়:-
বর্তমান নিবন্ধকারের জয়নুল-জীবনী বিষয়ক 'আমাদের জয়নুল' (১৯৮৫) গ্রন্থভুক্ত 'শিল্পী থেকে শিল্পাচার্য' অধ্যায়ের উদ্ধৃত কথাগুলি আমার এ-রচনার শিরোনামের সাথে ঘনিষ্ঠ- সে কারণে হুবহু উপস্থাপন করা গেলো। জয়নুল আবেদিনের শিল্পী ও ব্যক্তি জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অথচ মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার ওই ঘটনাটি ঘটেছিলো ১৯৬৭ সালে ঠিক যে-সময় ঢাকার আর্ট কলেজ পরিচয়ে সুবিদিত সরকারি চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে দীর্ঘ ১৮/১৯ বছর শিক্ষকতায় নিবেদিত থেকে ও প্রতিষ্ঠাতা-অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে অনিবার্য পরিস্থিতিতে ক্ষোভ-অভিমানের বশবর্তী হয়ে তিনি তাঁর পিতার মতোই স্বেচ্ছায় সরকারি চাকুরি থেকে অবসর গ্রহণ করেছিলেন। নানাভাবে নানাদিক থেকে শত চেষ্টা ও অনুরোধ-আবেদন করেও তাঁকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি তাঁরই নেতৃত্বে ১৯৪৮-এ প্রতিষ্ঠিত ওই চারুশিল্প শিক্ষায়তনে। শেষে উপায়ান্তর না দেখে মহান গুরুর প্রতি যথাযথ মর্যাদা প্রদানের পরিকল্পনা নিয়ে চারুকলার তৎকালীন শিক্ষার্থীরা তাঁকে তাঁর অনুপস্থিতিতেই 'শিল্পাচার্য' উপাধিতে ভূষিত করেছিলো।

জয়নুল আবেদিনের শিল্পাচার্য হওয়ার ঘটনাটি অনুঘটক পত্রিকার প্রবন্ধের স্বল্প পরিসরে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয় নাই। তবে আন্দাজ করা যায়, কর্তৃপক্ষের সাথে নীতিগত বিষয়ে হয়তো কোন মতদ্বৈধতা হয়েছিলো। ঠিক কত তারিখে ছাত্ররা সেই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলো সেটা উল্লেখ থাকলে পারিপার্শ্বিক ঘটনাবলীর স্বরূপ বোঝা যেত।
বিস্তারিত পড়ুন....

বৃহষ্পতিবার, ১৩ নভেম্বর, ২০০৮

অনুঘটক: এক যথার্থ সামাজিক অনুঘটক

নাহিদের কাছ থেকে শুনেছিলাম বেশ আগেই। কিন্তু পড়া হয়ে ওঠে নি। শহরে মাত্র ২ কপি বিতরণ করা হয়েছে। আকরামের (চশমা) কাছে ছিল একটা। তার কাছ থেকে নিয়ে অনুঘটক পত্রিকাটি পাঠ করলাম। ১ম বর্ষ ১ম সংখ্যা আগস্ট ২০০৮ শ্রাবণ ১৪১৫ সংখ্যা। বর্ণনা হিসেবে 'শিল্প-সাহিত্য সংস্কৃতি বিষয়ক পত্রিকা' বিশেষণ প্রয়োগ যে একেবারে যথার্থ হয়েছে, তা পত্রিকার আগাগোড়া পাঠ শেষে অনুভব করলাম।

বৈশ্বিক সংকটকে বিশ্লেষণ এবং তার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সমস্যাগুলির স্বরূপ উপলব্ধি যে ভিন্নমাত্রার আলোচনার বিষয় নয়, তা বুঝতে পত্রিকাটি সত্যিই অনুঘটকের কাজ করেছে। বহুজাতিক কোম্পানির বাণিজ্যক্ষুধা গ্রাস করতে চলেছে সারা পৃথিবীর শক্তিহীন জনগোষ্ঠীকে। বাংলাদেশও এদের সর্বব্যাপী থাবার নিচে বসে আছে। আমাদের দুর্বলতা, সীমাবদ্ধতা, সংকীর্ণতার সুযোগ তারা ব্যবহার করছে পুরোমাত্রায়। ফলে মানুষ থেকে যাচ্ছে নিরন্ন, হচ্ছে শোষিত। সম্পাদকীয়তে বিষয়টাকে সংক্ষেপে আলোচনা করা হয়েছে। প্রকাশক ও সম্পাদক সাবিনা আফজা হক কিছুটা দ্বীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেছেন -
গভীর এক সংকট চলছে বিশ্বজুড়ে। চেষ্টা চলছে গোটা পৃথিবীতে বহুজাতিক কোম্পানি ও তাদের দোসর শাসক সম্প্রদায়ের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার। গ্লোবালাইজেসন বা বিশ্বায়নের নামে দেশে দেশে আধিপত্যবাদী সম্প্রদায়ের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। আবার এর বিপরীতে নানা দেশে সচেতন মানুষের প্রতিবাদ সমাবেশও পরিচালিত হচ্ছে। আবার এর বিপরীতে নানা দেশে সচেতন মানুষের প্রতিবাদ সমাবেশও অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গড়ে উঠছে প্রতিরোধ। সংগ্রামী জনগণই পারে বর্তমান বিশ্ব-ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে নতুন এক বিশ্ব ব্যবস্থার প্রবর্তন করতে। আর জনগণের এই সংকটে, সংগ্রামে পাশে থাকার প্রত্যয় নিয়েই জন্ম অনুঘটকের।


মুনাফালোভী কোম্পানীগুলো বংলাদেশেও মুখোমুখি হয়েছে প্রতিবাদের। জনগণের প্রতিক্রিয়া দেশের বিভিন্ন জায়গাতে তাদের মুখোশ উন্মোচন করেছে। তেল-গ্যাস, কয়লাসহ সকল প্রাকৃতিক সম্পদের উপর আপামর জনগণের অধিকারের দাবী দীর্ঘদিনের। এদেশেও এটা গণবাদী। "অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের লেখায় জানা যায় কিভাবে অসম চুক্তির মাধ্যমে জনগণের সম্পদ বহুজাতিক কোম্পানীর কাছে ইজারা দেয়া হচ্ছে।" ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল অঞ্চলে অবস্থিত গারো পাহাড় ও তার পরিপার্শ্বের বনাঞ্চল দেশের মোট বনাঞ্চলের এক ক্ষুদ্র ভগ্নাংশে পরিণত হয়েছে। এই অবশেষটুকুর উপরেও নজর পড়েছে আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানীর। "লাউয়াছড়া বনে কর্পোরেট তেল-গ্যাস কোম্পানির ধ্বংসযজ্ঞে গ্যাস অনুসন্ধানের নামে কেবলমাত্র বনের প্রতিবেশ ও প্রাণবৈচিত্রেরই যে ক্ষতি হয়েছে তা নয়, লাউয়াছড়া বননির্ভর স্থানীয় খাসিয়া, ত্রিপুরী, চা-বাগানী ও প্রান্তিক বাঙালি জনগণের অস্থিত্বও হুমকির সম্মুখীন। পাভেল পার্থর লেখায় উঠে এসেছে সেই ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র।" সম্পাদক প্রতিবাদ করে বলেছেন:-
ঘোষিত হয়েছে "জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা ২০০৮।" সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিভাবে পশ্চাদপদ নারী সমাজের উন্নয়নের কোন দিক নির্দেশনাই নেই এ নীতিমালায়। তারপরেও ধর্মান্ধ মৌলবাদী গোষ্ঠীর লাঠি প্রদর্শনের কারণে এ নীতিমালাও এখন অন্ধকারে।
অনুঘটক পত্রিকার সম্পাদনা পর্ষদে আছেন-
  • শারমিন মৃধা
  • ডা. সারোয়ার জাহান
  • সারোয়ারী কামাল
  • সাহানা আজুবা হক
এঁদের সুচিন্তিত বিবেচনায় সূচীপত্রের যে রূপ তার সম্পূর্ণটুকু নিচে তুলে দিলাম।

প্রবন্ধ
* সমুদ্রসীমা, তেল-গ্যাস চুক্তি ও জনগণের স্বার্থ: আনু মুহাম্মাদ
* কর্পোরেট খুনখারাবি ও রক্তাক্ত লাউয়াছড়া: পাভেল পার্থ
* বাংলাদেশে পোস্ট মডার্ণ' বিপ্লবের উদাহরণ: শনির আখড়া: এম. এম. আকাশ
* হবিগঞ্জ জেলার চা শ্রমিকদের সরল জীবনচিত্র- ৭ হাত বাই ১৪ হাত ঘরে তিন পুরুষের বসবাস: জিয়াউল হক বাবলু
* পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি সমস্যা ও ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন: মঙ্গল কুমার চাকমা
* সংস্কৃতি আমাদের হারানো প্রত্যয়: আবুল কাশেম ফজলুল হক
* বাংলাদেশে চলচ্চিত্র শিল্প: গজ্‌নফর কবীর

গল্প
* শিবলী পাত্রিসিয়া: ফারুক হাসান

কবিতা
* মৈত্রী ট্রেন: রহমান হেনরী, রাজশ্রীরা হারিয়ে যাচ্ছে- বিশ্বায়নের ঝাঁঝালো বসন্তে: সরওয়ার জাহান
* এসো আজিকে এসো: প্রত্যয় জসীম, দৃশ্যের দৃশ্য: আশিক আকবর
* বর্ষা আকাশ নামায়: ইয়াসির আজিজ, আমি থাকি ঘোরে: শিহাব বাহাদুর
* আমার এ মৃত্যুকূপের: হিজল জোবায়ের, নিবেদিত কবিতা: নাজমা সুলতানা বেবী
* ভিন্ন ভাষার কবিতা- আমির বারাকা: ভাষান্তর তুহিন তৌহিদ

বিজ্ঞান
* বুদ্ধির উদবর্তন মূল্য ও প্রজাতির অস্তিত্ব: রুশো তাহের

চিন্তা
* অবসাদের অধ্যাস: শাহজাহান চাকলাদার
* সাম্প্রতিক কবিতা- পরিপ্রেক্ষেত বিবেচনা: আহমেদ ফিরোজ

স্মরণ
* গুরু আমার অমর গুরু: মতলুব আলী
* ভাবনায় সেলিম আল দীন:পীযূষ শিকদার

নারী
* রাষ্ট্র পরিচালনায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ অপরিহার্য: সাবিনা আফজা হক

পত্রিকাটিকে সম্পূর্ণ করে তুলতে সম্পাদক ও সম্পাদনা পর্ষদের সদস্যরা নিয়ত ক্লান্তিহীন চেষ্টা চালিয়েছেন একথা অকুন্ঠচিত্তে স্বীকার করছি। এই ধরণের বিষয়সমৃদ্ধ পত্রিকা বিক্রি হয় কম। সেকথা তাঁরা বিলক্ষণ জানতেন। সেকথা স্বীকার করেছেন সম্পাদকীয়তেও:- "নতুন বছরের বাজেট পাশ হয়ে গেছে আরেক দফা বেড়েছে তেল-গ্যাসসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম, নাভিশ্বাস অবস্থা সাধারণ মানুষের। তারপর সামনে রমজান, 'মরার উপর খাঁড়ার ঘা' অবস্থা জনগণের।" তারপরও সামাজিক দায়বদ্ধতাকে সম্পাদকগণ এড়িয়ে যেতে চাননি। তাদের এই চেতনাকে সম্মান করি।
# সম্পাদকীয়তে আলোকচিত্রী চলমান এর ছবির কথা বলা হয়েছিল। মনে হয়েছিল একাধিক ছবি থাকবে। কিন্তু রয়েছে মাত্র একটি। খাদ্যসঙ্কটের কথা বলা সেই ছবিটি সবশেষ পাতায় (পৃ-৩২) এমনভাবে দেয়া হয়েছে যে চোখে পড়েনা। কোন হেডিং নেই। পরবর্তী সংখ্যায় এটা সংশোধন করা হবে বলে প্রত্যাশা করি।
বিস্তারিত পড়ুন....

শনিবার, ১ নভেম্বর, ২০০৮

মেসেদিনী

মুজতবা আলীর 'পঞ্চতন্ত্র' বই থেকে কিছু মজার ঘটনা পূর্বের দুটি পোস্টে (পোস্ট এক এবং পোস্ট দুই) লিখেছিলাম। আজ একই বই থেকে আরেকটি কাহিনী পড়বো। মেসেদিনী শীর্ষক রচনাটিতে লেখক সংক্ষেপে দেশপ্রেম, মাতৃভাষার প্রতি ভক্তি এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সম্পর্কে অনুকরণীয় উদাহরণ প্রকাশ করেছেন।

মুজতবা আলী একবার ভারতবর্ষে ফিরছিলেন। জাহাজে অনেক যাত্রীর মধ্যে একজন মহিলা যিনি বোম্বেতে (অধুনা মুম্বাই) আসছিলেন। লন্ডনে তার স্বামী ব্যবসা জমিয়ে বসেছে। ভারতে মেয়ের বাড়িতে আসছেন। ইংল্যান্ডে বাড়ি বানাবার পূর্বে তারা ইরানে থাকতেন। ইরানের মেসেদে তাদের ব্যবসা ছিল। লন্ডনে আটবছর বাস করেও মহিলা একবর্ণ ইংরেজি শেখেননি। যে সময়ের কাহিনী (৩০ এর দশক) সে সময়ে ইরানে ইহুদীরাও যে বাস করতো তার একটি চিত্র এই মেসেদিনী রচনাটি থেকে জানতে পারলাম।

মহিলা ইংরেজি না জানার কারণে কারও সাথে কথা বলতেন না। মুজতবা আলী ফার্সী ভাষায় তার সঙ্গে কথা বলতেন। তাকে পেয়ে মহিলা হাঁফ ছেড়েছিলেন। জাহাজ ছেড়ে আসার পর থেকে কারও সাথে কথা বলতে না পেরে তিনি হাঁপিয়ে উঠেছিলেন। ইংরেজি শেখেননি কেন এ কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন:-
লণ্ডনে তো আমি ইচ্ছে করে যাই নি। আমার স্বামী মেশেদে সর্বস্বান্ত হয়ে লণ্ডন গেলেন তাঁর কাকার কাছে। আমরা ইহুদি, জানেন তো, আমরা ব্যবসা করি দুনিয়ার সর্বত্র। সেখানে ওঁর দু'পয়সা হয়েছে, কিন্তু আমাদ্বারা আর ইংরিজি শেখা হল না। ইরানী ইহুদিরা যে দু'চারজন লণ্ডনে আছেন, তাঁদের সঙ্গেই মেলামেশা করি, কথাবার্তা কই। তবে হাট করতে গিয়ে "গ্রীন পীজ, কলি-ফ্লাওয়ার, ট্যাপেল, ত্রাপেন্স-হে পেনি" বলতে পারি, ব্যস।
স্বামী লণ্ডনে গিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। দিনে দিনে তার ব্যবসার প্রসার বাড়ছে। তার আর লণ্ডন ছাড়ার ইচ্ছে নেই। মহিলা কিন্তু লণ্ডন শহরটাকে মোটেও ভালবাসতে পারছেন না। মেসেদ শহরের স্মৃতি তাকে প্রায়ই কাতর করে তোলে। জন্মভূমির জন্য তার আকুলতা তার বক্তব্যের প্রত্যেক লাইনে স্পষ্ট।

লণ্ডন সাফসুৎরো জায়গা, বিজলি বাতি, জলের কল, খাওয়া-দাওয়া, থিয়েটার সিনেমা সবই ভালো- কোথায় লাগে তার কাছে বুড়ো গরীব মেশেদ? তবু যদি জানতুম একদিন সেই মেশেদে ফিরে যেতে পারবো, তাহলেও না হয় লণ্ডনটার সঙ্গে পরিচয় করার চেষ্টা করতুম, কিন্তু যখনই ভাবি ঐ শহরে আমাকে একদিন মরতে হবে, আমার হাড় ক'খানা বাপ-পিতামোর হাড়ের কাছে জায়গা পাবে না, তখন যেন সমস্ত শহরটা আমার দুশমন, আমার জল্লাদ বলে মনে হয়।
জাহাজে কয়েকদিন সঙ্গ পেয়ে (আসলে একমাত্র তার সাথেই মাতৃভাষায় কথা বলতে পেরেছেন বলে) মহিলা মুজতবা আলীর উপর খুব কৃতজ্ঞ বোধ করছিলেন। বোম্বে পৌছে লেখককে আর হোটেলে উঠতে দেননি। মেয়ের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছেন। জাহাজ ঘাটে পৌছলে, কাস্টমস এর আনুষ্ঠানিকতা শেষে মহিলা মুজতবা আলীকে ধরে নিয়ে গিয়ে মেয়ে ও জামাই এর সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন:
এই আমার বন্ধু দিল-জানের দোস্ত, আমার সঙ্গে ফার্সী কথা কয়েছে, ফুর্তি-ফার্তি হৈ-হল্লা ছেড়ে দিয়ে। মেয়ে যতই জিজ্ঞেস করে, জাহাজে ছিলে কি রকম, খেলে কি, বাবা কি রকম আছেন, কে বা শোনে কার কথা, সত্য-সত্যই জাহাজে যেন 'সমুদ্রে রোদন।' তিনি বারবার বলেন, 'বুঝলি, নয়মি, এঁকে আচ্ছাসে খাইয়ে দিতে হবে। পোলাওর সব মালমশলা আছে তো বাড়িতে?'
লেখক তাদের সাথে তিন দিন ছিলেন। এই তিন দিন কেমন ছিলেন, তা লেখকের জবানীতে শোনা যাক:
সে তিন দিন কি রকম ছিলুম? মাছ যে রকম জলে থাকে। ভুল বলা হল: মাছকে যদি শুধান, 'কি রকম আছে?' তবে সে বলবে, 'সৈয়দের ব্যাটা যে রকম ইহুদী পরিবারে ছিল'।

বিস্তারিত পড়ুন....

রবিবার, ১২ অক্টোবর, ২০০৮

মুজতবা আলীর 'পঞ্চতন্ত্র' থেকে ০১

সৈয়দ মুজতবা আলী'র 'পঞ্চতন্ত্র' বইটি থেকে আরও কয়েকটি মজার ঘটনা উদ্ধৃত করার লোভ সামলাতে পারছি না।
বর্ষা নামক নিবন্ধটি থেকে আমরা জানতে পারি, মিসরের কায়রোতে বৃষ্টি খুব কম হয়। লেখকের ভাষ্যে 'কাইরোতে বছরে ক'ইঞ্চি বৃষ্টি পড়ে এতদিন বাদে সে কথা আমার স্মরণ নেই। আধা হতে পারে সিকিও হতে পারে।' এটুকু পাঠ করেই বোঝা যাচ্ছে কায়রোতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কেমন। তো, কায়রোতে লেখকের চোখের সামনেই একদিন বৃষ্টি এল। এই বৃষ্টি নিয়েই সুদানের এক ছেলে একটি গল্প বলল। গল্পটি এরকম:-
সুদানের একটি ছেলের সঙ্গে আলাপ হ'ল। সে বললে, তার দেশে নাকি ষাট বছরের পর একদিন হঠাৎ কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি নেবেছিল। মেয়েরা কাচ্চা-বাচ্চারা, এমন কি গোটা কয়েক জোয়ান মদ্দরা পর্যন্ত হাউমাউ করে কান্নাকাটি জুড়েছিল, 'আকাশ টুকরো টুকরো হয়ে আমাদের ঘাড়ে ভেঙ্গে পড়লো গো। আমরা যাব কোথায়? কিয়ামতের (মহাপ্রলয়ের) দিন এসে গেছে। সব পাপের তওবা (ক্ষমা-ভিক্ষা) মাঙবার সময় পেলুম না, সবাইকে যেতে হবে নরকে।' গাঁও-বুড়োরা নাকি তখনো সান্তনা দিয়ে বলেছিলেন, 'এতে ভয় পাবার কিছু নেই। আকাশটুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ছে না। এ যা নাবছে সে জিনিস জল। এর নাম মৎর্‌ (অর্থাৎ বৃষ্টি)।' সুদানী ছেলেটি আমায় বুঝিয়ে বললে,'আরবী ভাষায় মৎর্‌ (বৃষ্টি) শব্দ আছে; কারণ আরব দেশে মাঝে মাঝে বৃষ্টি হয়, কিন্তু সুদানে যে আরবী ভাষা প্রচলিত সে-ভাষায় মৎর্‌ শব্দ কখনো ব্যবহৃত হয়নি বলে সে শব্দটি সুদানী মেয়েছেলেদের সম্পূর্ণ অজানা।'
বেদে নামক নিবন্ধে লেখক প্রথমেই একটু ভূমিকা টেনেছেন। সেখানে 'রাসল পাশা'র একটি বইয়ের কথা বলেছেন। এই বইয়ে রাসল পাশা মন্তব্য করেছেন, পৃথিবীর সকল বেদের (জিপসী) ভাষা আদতে ভারতীয়। মুজতবা আলী এটা বিশ্বাস করতে চাননি। সন্দেহ পোষণ করেছেন এভাবে:
পণ্ডিত নই, তাই চট করে বিশ্বাস করতে প্রবৃত্তি হয় না। ইউরোপীয় বেদেরা ফর্সায় প্রায় ইংরেজের সামিল, সিংহলের বেদে ঘনশ্যাম। আচার-ব্যবহারেও বিস্তর পার্থক্য, বৃহৎ ফারাক। আরবিস্থানের বেদেরা কথায় কথায় ছোরা বের করে, জর্মনীর বেদেরা ঘুষি ওঁচায় বটে, কিন্তু শেষটায় বখেড়ার ফৈসালা হয় বিয়ারের বোতল টেনে। চীন দেশের বেদেরা নাকি রূপালি ঝরণাতলায় সোনালি চাঁদের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে চুকুস চুকুস করে সবুজ চা চাখে।
কিন্তু নিজের জীবনের একটি ঘটনার শেষে তিনি বিশ্বাস না করে পারলেন না। তখন তিনি জার্মানীর রাজধানীতে। বয়স ২৫/২৬। একদিন কলেজের পাশের কাফেতে বসে কফি খাচ্ছিলেন। তখন এক বেদেনী তাকে 'যবনিকা' ভাষায় কি জানি বলতে লাগল। "সে ভাষা আমার চেনা-অচেনা কোন ভাষারই চৌহদ্দি মাড়ায় না, কিন্তু শোনালো - তারই মুখের মত-মিষ্টি।" পরে কাফে মালিক মুজতবা আলীর অনুরোধের প্রেক্ষিতে যখন বললেন যে তিনি ভারতীয়, তখন মেয়েটা হুঙ্কার দিয়ে কাফেওয়ালাকে বলল, "সেই কথাইতো হচ্ছে। আমরা বেদে, ভারতবর্ষ আমাদের আদিম ভূমি। এও ভারতীয়। আমার জাতভাই। ভদ্রলোক সেজেছে, তাই আমার সঙ্গে কথা কইতে চায় না।" পরে মুজতবা আলীর সাথে আলাপচারিতায় জানা গেল। এরা বেদে, কিন্তু পড়াশোনা করে না। তারা ভাবতেও পারে না, কোন বেদে কখনও পড়াশোনার চৌহদ্দি মাড়িয়েছে।
" বুঝতে পেরেছি বাপু, বুঝতে পেরেছি; বাপ তোমার দু'পয়সা রেখে গিয়েছে- হঠাৎ নবাব হয়েছ। এখন আর বেদে পরিচয় দিতে চাও না! হাতে আবার খাতাপত্র- কলেজ যাও বুঝি? ভদ্রলোক সাজার শখ চেপেছে, না?"
আমি বললুম, 'ফ্রালাইন, তুমি ভুল বুঝেছ। আমার সাতপুরুষ লেখাপড়া করেছে। আমিও তাই করছি। ভদ্রলোক সাজা না সাজার কোনো কথাই উঠছে না।'
মেয়েটি এমনভাবে তাকালো যার সোজা অর্থ 'গাঁজা গুল'। জিজ্ঞেস করল, 'তুমি ভারতীয় নও?
'আমি বললুম, 'আলবৎ'!
আনন্দের হাসি হেসে বলল, 'ভারতীয়েরা সব বেদে।'
আমি বললুম, 'সুন্দরী, তোমরা ভারতবর্ষ ছেড়েছ, দু-হাজার বছর কিংবা তারও পূর্বে। বাদবাকী ভারতীয়রা এখন গেরস্থালী করে।'
মুজতবা আলীর বক্তব্য মেয়েটা কিছুতেই বিশ্বাস করে নি। পরে জানাল শহরের বাইরে রাখা তাদের সার্কাসের গাড়ি রাখা আছে। তার বাবা-মার সাথে তর্ক করার আমন্ত্রণ জানাল। বলল -"বাবা সব জানে। কাচের গোলার দিকে তাকিয়ে সব বাৎলে দেবে।"

ভাষাতত্ত্ব নিবন্ধের একটি রসিকতা।
'ফরাসী ভাষাটা সব সময় ঠিক বুঝতে পারি কি না বলা একটু কঠিন। এই মনে করুন, কোনো সুন্দরী যখন প্রেমের আভাস দিয়ে কিছু বলেন, তখন ঠিক বুঝতে পারি আবার যখন ল্যান্ডলেডি ভাড়ার জন্য তাগাদা দেন তখন হঠাৎ আমার তাবৎ ফরাসী ভাষাজ্ঞান বিলকুল লোপ পায়।'

দাম্পত্য জীবন নামক নিবন্ধে তিনটি সংস্কৃতির দাম্পত্য জীবন নিয়ে কাহিনী আছে। মুজতবা আলীর একজন চীনা বন্ধু ছিল। তারা দুজনে অফিস ফাঁকি দিয়ে প্রায়ই ক্লাবে এসে আড্ডা দিতেন। ক্লাবের এক কোনে নিমগাছের তলায় বসে তারা গল্পগুজবে মজে যেতেন। সাথে একজন ইংরেজ ছিলেন। কথায় কথায় তাদের মধ্যে একটি বিবাহিত জীবন নিয়ে আলোচনা শুরু হল। প্রথমে ইংরেজের গল্প। তাঁর গল্পটি এরকম। লন্ডনে একবার স্বামীদের বিরাট প্রতিবাদ সভা হচ্ছিল। মিছিল মিটিং চলছে।
প্রসেশনের মাথায় ছিল এক পাঁচ ফুট টিঙটিঙে হাড্ডি-সার ছোকরা। হঠাৎ বলা নেই, কওয়া নেই ছ'ফুট লম্বা ইয়া লাশ এক ঔরৎ দুমদুম করে তার দিকে এগিয়ে গিয়ে তার হাত ধরে এক হ্যাঁচকা টান দিয়ে বললে, 'তুমি এখানে কেন, তুমি তো আমাকে ডরাও না। চলো বাড়ি।' সুড়সুড় করে ছোকরা চলে গেল সেই খাণ্ডার বউয়ের পিছনে পিছনে।'
এবার চীনা বন্ধুর গল্প। চীনা গুণী আচার্য সূ রচিত শাস্ত্রে এই ঘটনার উল্লেখ আছে। একবার পেপিং শহরে অত্যাচার-জর্জরিত স্বামীরা এক প্রতিবাদ সভার আয়োজন করেছিল। কিভাবে স্বামীদেরকে খান্ডার গৃহিনীদের হাত থেকে উদ্ধার করা যায় সেই বিষয়ের আলোচনা সভার প্রধান উদ্দেশ্য। সভাপতি ছিলেন ষাট বছর ধরে দজ্জাল গিন্নীর হাতে নিপীড়িত এক দাড়িওয়ালা অধ্যাপক। সভায় বক্তারা নিজ নিজ অভিজ্ঞতা বলে গেলেন। -"স্ত্রীলোকের অত্যাচারে দেশ গেল, ঐতিহ্য গেল, ধর্ম গেল, সব গেল, চীন দেশ হটেনটটের মুল্লুকে পরিণত হতে চলল, এর একটা প্রতিকার করতেই হবে। ধন-প্রাণ, সর্ব দিয়ে এ অত্যাচার ঠেকাতে হবে' ইত্যাদি ইত্যাদি। এমন সময় দারোয়ান হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে জানালো এ সভার খবর পেয়ে গিন্নীরা 'ঝাঁটা, ছেড়া জুতো, ভাঙা ছাতা' ইত্যাদি নিয়ে তেড়ে আসছে। এ কথা শুনে তো সবাই পড়িমড়ি করে পালিয়ে গেল। শুধুমাত্র সভাপতি তার আসনে শান্ত গম্ভীর মুখ নিয়ে বসে আছেন। দারোয়ান কাছে গিয়ে বলল-
হুজুর যে সাহস দেখাচ্ছেন তাঁর সামনে চেঙ্গিস খান তসলীম ঠুকতেন, কিন্তু এ তো সাহস নয়, এ হচ্ছে আত্মহত্যার শামিল। গৃহিনীদের প্রসেশনে সক্কলের পয়লা রয়েছেন আপনারই স্ত্রী। এখনো সময় আছে। আমি আপনাকে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাচ্ছি।। সভাপতি তবু চুপ। তখন দারোয়ান তাঁকে তুলে ধরতে গিয়ে দেখে তাঁর সর্বাঙ্গ ঠাণ্ডা। হার্টফেল করে মারা গিয়েছেন।
এবার মুজতবা আলীর পালা। গল্পটি অবশ্য পরিচিত। রাজা নিজ বৌয়ের (রাণীর) অত্যাচারে মন খারাপ করে বসে আছেন। মন্ত্রী কারণ জানতে চাইলে বললেন- "ঐ রাণীটা- ওঃ কি দজ্জাল, কি খাণ্ডার। বাপরে বাপ! দেখলেই বুকের রক্ত হিম হয়ে আসে।"
মন্ত্রী বললেন এ আর কি ব্যাপার, বউকে তো সবাই ডরায়। এজন্য মন খারাপ করে বসে থাকতে হবে নাকি? রাজা বিশ্বাস না করলে মন্ত্রী জনসমাবেশের ব্যবস্থা করলেন। সেখানে বলা হলো, যারা বউকে ভয় পায়না তারা একদিকে আর যারা ভয় পায় তারা পাহাড়ের দিকে যেন যায়। মুহূর্তের মধ্যে পাহাড়ের দিকটা ভর্তি হয়ে গেল। একজন শুধু ফাকা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। তখন মন্ত্রী তাকে ডেকে বললেন-"তুমি যে বড় ওদিকে দাঁড়িয়ে? বউকে ডরাও না বুঝি?"
লোকটা কাঁপতে কাঁপতে কাঁদো কাঁদো হয়ে বললে, 'অত শত বুঝি নে, হুজুর। এখানে আসবার সময় বউ আমাকে ধমক দিয়ে বলেছিল, "যেদিকে ভিড় সেখানে যেয়ো না।" তাই আমি ওদিকে যাই নি।'
বিস্তারিত পড়ুন....

বুধবার, ৮ অক্টোবর, ২০০৮

সৈয়দ মুজতবা আলীর পঞ্চতন্ত্র

সৈয়দ মুজতবা আলী রচিত 'পঞ্চতন্ত্র' বইটি পড়লাম। তাঁর সব কটা বই এখনও আমি যে পড়ে উঠতে পারি নি, সেকথা স্বীকার করতে বিব্রত বোধ করছি। তাঁর 'দেশেবিদেশে', 'চাচাকাহিনী' বইদুটোই শুধু পড়েছি। বিখ্যাত 'শবনম' উপন্যাসটি এখনও পড়তে পারিনি।

আসলে বই কেনার অভ্যাসটাই আমাদের মধ্যে এখনও তেমনভাবে গড়ে ওঠেনি। আবার সামর্থ্য থাকলেও বই কেনার আগ্রহ ও সদিচ্ছার অভাবটাও মাঝেমধ্যে প্রকট হয়ে ওঠে। সৈয়দ মুজতবা আলীর বিখ্যাত 'বইকেনা' প্রবন্ধটি অনেকেরই পড়া আছে। এই প্রবন্ধটির মূল বক্তব্যও কিন্তু বই পড়া ও বইকেনার অভ্যাসকে নিয়েই। এই বইকেনা প্রবন্ধটি তাঁর 'পঞ্চতন্ত্র' গ্রন্থের অন্তর্ভূক্ত। পঞ্চতন্ত্র বইয়ের বেশিরভাগ রচনা ত্রিশের দশকের সমসাময়িক ঘটনাবলী নিয়ে রচিত।

তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের ছাত্র ও শিক্ষক সৈয়দ মুজতবা আলীর ভাষাতত্ত্ব ও ধর্মতত্ত্বে পাণ্ডিত্য ছিল অসাধারণ। একাধিক বিদেশী ভাষা যেমন সংস্কৃত, হিন্দি, আরবি, ফারসি, উর্দু, মারাঠি, গুজরাটি, ইংরেজি, ফরাসি, ইতালিয়ান ও জার্মান ভাষায় তিনি দক্ষ ছিলেন। তাকে পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্মতত্ত্ব ও তার তুলনামূলক বিচারে এই উপমহাদেশের স্বল্পসংখ্যক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে অন্যতম বলা হয়।


তাঁর পঞ্চতন্ত্র গ্রন্থটি অনেকগুলো প্রবন্ধের একটি সংকলন। গ্রন্থের সূচনায় লেখকের বয়ানে জানা যায়:-
এই পুস্তিকার অধিকাংশ লেখা রবিবারের 'বসুমতী' ও সাপ্তাহিক 'দেশ' পত্রিকায় বেরোয়। অনুজপ্রতিম শ্রীমান কানাই সরকার ও সুসাহিত্যিক শ্রীযুক্ত মনোজ বসু কেন যে এগুলো পুস্তিকাকারে প্রকাশ করার জন্য আমাকে বাধ্য করলেন সে কথা সুহৃদয় পাঠকেরা বিবেচনা করে দেখবেন।
সৈয়দ মুজতবা আলী, নয়াদিল্লী, আষাঢ়, ১৩৫৯
পঞ্চতন্ত্র বইটির সূচিপত্র বেশ সমৃদ্ধ। সবগুলো রচনাকে দুইপর্বে সাজানো হয়েছে।
  • প্রথম পর্ব ও
  • দ্বিতীয় পর্ব
প্রথম পর্বে প্রবন্ধ রয়েছে মোট ৩৫টি আর দ্বিতীয় পর্বে রয়েছে ৩৪টি। সৈয়দ মুজতবা আলী তার পাণ্ডিত্যমিশ্রিত রসবোধের জন্য বিখ্যাত। তাঁর সে অসাধারণ সামর্থ্যের পরিচয় প্রতিটি প্রবন্ধেই রয়েছে। কয়েকটি প্রবন্ধ থেকে উল্লেখযোগ্য অংশ তুলে ধরছি।
বার্ট্রাণ্ড রাসেল বলেছেন- সংসারে জ্বালা-যন্ত্রণা এড়াবার প্রধান উপায় হচ্ছে, মনের ভিতর আপন ভুবন সৃষ্টি করে নেওয়া এবং বিপদকালে তার ভিতরে ডুব দেওয়া। যে যত বেশী ভুবন সৃষ্টি করতে পারে, ভবযন্ত্রণা এড়াবার ক্ষমতা তার বেশী হয়।- বই কেনা
কোনটা মহত্ত্বর? জ্ঞানার্জন নাকি ধনার্জন? এ বিষয়ক একটি সমস্যার সমাধান লেখক খুঁজে পেয়েছেন জনৈক আরব পণ্ডিতের লেখাতে।
পণ্ডিত লিখেছেন- 'ধনীরা বলে, পয়সা কামানো দুনিয়াতে সবচেয়ে কঠিন কর্ম কিন্তু জ্ঞানীরা বলেন, না, জ্ঞানার্জন সবচেয়ে শক্ত কাজ। এখন প্রশ্ন, কার দাবিটা ঠিক, ধনীর না জ্ঞানীর? আমি নিজে জ্ঞানে সন্ধানে ফিরি, কাজেই আমার পক্ষে নিরপেক্ষ হওয়া কঠিন। তবে একটা জিনিস আমি লক্ষ্য করেছি, সেইটে আমি বিচক্ষণ জ্ঞানের চক্ষু-গোচর করতে চাই। ধনীর মেহন্নতের ফল হল টাকা। সে ফল যদি কেউ জ্ঞানীর হাতে তুলে দেয়, তবে তিনি সেটা পরমানন্দে কাজে লাগান, এবং শুধু তাই নয়, অধিকাংশ সময়েই দেখা যায়, জ্ঞানীরা পয়সা পেলে খরচ করতে পারেন ধনীদের চেয়ে অনেক ভালো পথে, ঢের উত্তম পদ্ধতিতে। পক্ষান্তরে, জ্ঞানচর্চার ফল সঞ্চিত থাকে পুস্তকরাজিতে এবং সে ফল ধনীদের হাতে গায়ে পড়ে তুলে ধরলেও তারা তার ব্যবহার করতে জানে না।- বই পড়তে পারে না।'- বই কেনা
আরব পণ্ডিতের বক্তব্য শেষ হয়েছে এই বলে যে 'অতএব সপ্রমাণ হল জ্ঞানার্জন ধনার্জনের চেয়ে মহত্তর।'
মুজতবা আলী এই গল্পের উপসংহারে বলেছেন -"তাই প্রকৃত মানুষ জ্ঞানের বাহন পুস্তক যোগাড় করার জন্য অকাতরে অর্থ ব্যয় করে।'- বই কেনা
'আহারাদি' প্রবন্ধটিতে খাবারের আন্তর্জাতিক রূপ যে কত বৈচিত্র্যময় তার একটি মনোজ্ঞ বর্ণনা পাওয়া যায়। এখান থেকে কয়েকটা খাবারের দেশিবিদেশী নাম জেনে নেই।
  • আমাদের দেশের মাংশের ঝোল এবং প্যারিসের রেস্তোরাগুলোতে পরিবেশিত 'হাঙ্গেরিয়ান গুলাশ' এর মধ্যে মূলগত কোন পার্থক্য নেই।
  • 'ইতালিয়ান রিসেত্তো' মূলত ভারতীয় পোলাও মাংসের মতই।
আহারাদি প্রবন্ধ থেকে একটু বর্ণনা করি।
কাইরোতে (কায়রো) খেলেন মিশরী রান্না। চাক্তি চাক্তি মাংস খেতে দিল, মধ্যিখানে ছ্যাঁদা। দাঁতের তলায় ক্যাঁচ ক্যাঁচ করে বটে, কিন্তু সোওয়াদ খাসা। খাচ্ছেন আর ভাবছেন বস্তুটা কি, কিন্তু কোন হদিস পাচ্ছেন না। হঠাৎ মনে পড়ে যাবে, খেয়েছি বটে আমজাদিয়ায় এই রকম ধারা জিনিস- শিক কাবাব তার নাম। তবে মসলা দেবার বেলায় কঞ্জুসী করেছে বলে ঠিক শিক কাবাবের সুখটা পেলেন না।

একই রান্না বিভিন্ন দেশে গিয়ে কিছুটা পরিবর্তিত হয়ে ভিন্ন নাম গ্রহণ করেছে। মানুষের রুচি, অভ্যাস ছাড়াও রাজনৈতিক, সামাজিক ইত্যাদি প্রভাব এর অন্যতম কারণ। ইতিহাস পাঠ করতে গিয়ে এর সন্ধান মেলে। তুর্কি ও পাঠানরা যখন ভারত জয় করে, তখন ভারতের পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলের মানুষেরা নিরামিষভোজী ছিল। তুর্কিদের প্রভাবে তারা মাংস খাওয়ায় অভ্যস্ত হয়। তুর্কিরাও পূর্বে মাংসের সাথে মসলা মেশাতে জানতো না। ভারতীয়দের প্রভাবে তারাও মশলা খাওয়া শুরু করে। নিজেদের ঐতিহ্যবাহী রান্নার সাথে ভারতীয় মসলার মিশ্রণে যে অসাধারণ রান্নার আবিষ্কার হল, তারই নাম মোগলাই রান্না। মোগলাই রান্নার ঘ্রাণ আস্তে আস্তে সারা ভারতকে ছেয়ে ফেলেছে। এই তুর্কিরা পরে যখন বল্কান অঞ্চল জয় করে হাঙ্গেরি পার হয়ে ভিয়েনাতে গিয়ে হাজির হয়, তখন মোগলাই মাংসের ঝোল পরিবর্তিত হয়ে 'হাঙ্গেরিয়ান গুলাশ' নাম ধারণ করল। মিশর ও তুর্কিদের সঙ্গে যোগাযোগের ফলে ভেনিসের মানুষ 'মিনসটমীটের' পোলাও বা 'রিসোত্তো' বানাতে শিখে ফেলল। গ্রিস তুরস্কের অধিকারভুক্ত ছিল বলে গ্রিসের রান্নাতেও মশলার যথেষ্ঠ ব্যবহার রয়েছে।

ভোজনবিলাসী মানুষ ছিলেন মুজতবা আলী। খাদ্যরসিকদের প্রতি তার যে ভালোবাসা, তা থেকে তিনি মন্তব্য করেছেন:-
পৃথিবীতে দ্বিতীয় উচ্চাঙ্গের রান্না হয় প্যারিসে কিন্তু মশলা অতি কম, যদিও রান্না ইংরেজী রান্নার চেয়ে ঢের ঢের বেশী। এককালে তামাম ইয়োরোপে ফ্রান্সের নকল করত, তাই বল্কান গ্রীসেও প্যারিসী রান্না পাবেন। গ্রীস উভয় রান্নার সঙ্গমস্থল। বাকি জীবনটা যদি উত্তম আহারাদি করে কাটাতে চান, তবে আস্তানা গাড়ুন গ্রীসে (দেশটাও বেজায় সস্তা)। লাঞ্চ, ডিনার, সাপার খাবেন ফরাসী মোগলাই এবং ঘরোয়া গ্রীক কায়দায়।
নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোসকে নিয়ে তার লেখা নেতাজী প্রবন্ধ থেকে দুটো অংশ উদ্ধৃত করি। সেকালের অর্থাৎ ব্রিটিশ আমলে দেশ স্বাধীন করার লড়াইয়ে হিন্দু-মুসলিম সমস্যাটা বেশ প্রকট ছিল। পরস্পরের মধ্যে হিংসা বিদ্বেষ এত বেশি ছিল যে শেষ পর্যন্ত ধর্মের নামে একটি অখণ্ড দেশ একাধিক ভাগে ভাগ হয়ে গেল। বেশিরভাগ নেতাদের মধ্যেই কোন না কোন ধর্মের প্রতি সহানুভূতি ছিল বা তারা কোন একটি ধর্মাবলম্বী মানুষদের পক্ষে কথা বলতেন। সেই ধর্মের মানুষেরাই শুধু তাকে সমর্থন করত। এর মধ্যে ব্যতিক্রম ছিলেন নেতাজী সুভাষচন্দ্র।
একদিকে যেমন দেখতে পাই, সুভাষচন্দ্র 'আজাদ হিন্দ' নামটি অনায়াসে সর্বজনপ্রিয় করে তুললেন, অন্যদিকে দেখি, কৃতজ্ঞ মুসলমানেরা তাঁকে 'নেতাজী' নাম দিয়ে হৃদয়ে তুলে নিয়েছে- 'কাইদ-ই-আকবর' বা ঐ জাতীয় কোনো দুরূহ আরবী খেতাব তাঁকে দেবার প্রয়োজন তারা বোধ করে নি।
হিন্দি-উর্দু ভাষা নিয়ে সে সময়ের রাজনৈতিক নেতারা সবসময় বিচলিত ছিলেন। কিন্তু সুভাষচন্দ্রের সে জাতীয় কোন সমস্যা ছিল না। মুজতবা আলীর ভাষায়-
রাজনৈতিক অন্তর্দৃষ্টি যে মহাত্মার থাকে, দেশকে সত্যই যিনি প্রাণ-মন সর্বচৈতন্য সর্বানুভূতি দিয়ে ভালবাসেন, সাম্প্রদায়িক কলহের বহু উর্দ্ধে নির্দ্বন্দ্ব পুণ্যলোকে যিনি অহরহ বিরাজ করেন, যে মহাপুরুষ দেশের অখণ্ড সত্যরূপ ঋষির মত দর্শন করেছেন, বাক্যব্রহ্ম তাঁর ওষ্ঠাগ্রে বিরাজ করেন। তিনি যে ভাষা ব্যবহার করেন, সে-ভাষা সত্যের ভাষা, ন্যায়ের ভাষা, প্রেমের ভাষা। সে-ভাষা শুদ্ধ হিন্দী অপেক্ষাও বিশুদ্ধ হিন্দী, শুদ্ধ উর্দু অপেক্ষাও বিশুদ্ধ উর্দু। সে ভাষা তাঁর নিজস্ব ভাষা।
সুভাষচন্দ্র দেশের সমস্যাটিকে এমনভাবে সবার সামনে উপস্থাপন করতে পেরেছেন যে, সাম্প্রদায়িক তুচ্ছতাকে মানুষ মোটেও আমলে নেয়নি।
আমার মনে হয়, সুভাষচন্দ্র এমন এক বৃহত্তর জাজ্বল্যমান আদর্শ জনগণের সম্মুখে উপস্থিত করতে পেরেছিলেন, এবং তাঁর চেয়েও বড় কথা, এমন এক সর্বজনগ্রহণীয় বীরজনকাম্য পন্থা দেখাতে পেরেছিলেন যে, কি হিন্দু, কি মুসলমান, কি শিখ সকলেই সাম্প্রদায়িক স্বার্থের কথা সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে দেশের স্বাধীনতা-সংগ্রামে যোগদান করেছিলেন। আমি যেন চোখের সামনে দেখতে পাই, সুভাষচন্দ্র বলছেন, 'আগুন লেগেছে, চল আগুন নেভাই, এই আমার হাতে জল। তোমরাও জল নিয়ে এসো।' সুভাষচন্দ্র কিন্তু এ কথা বলছেন না, আগুন নেভাতে হলে হিন্দু-মুসলমানকে প্রথমে এক হতে হবে, তারপর আগুন নেভানো হবে।
সৈয়দ মুজতবা আলীর পঞ্চতন্ত্র বইটি প্রকাশ করেছে স্টুডেন্ট ওয়েজ। এর প্রিন্টার্স লাইনে প্রকাশকাল সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য নেই। অন্তত: প্রথম প্রকাশ কাল উল্লেখ করা উচিত ছিল। এখানে লেখা আছে 'এস.ওয়েজ দ্বিতীয় সংস্করণ বৈশাখ ১৪১৫ বঙ্গাব্দ'। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হল এস. ওয়েজের প্রথম সংস্করণ কত সালে হয়েছিল তা বইয়ের কোথাও খুঁজে পেলাম না।
বিস্তারিত পড়ুন....
 

About Me

আমার ফোটো
সুশান্ত বর্মন
শিক্ষাজীবী। ছবি তোলা, ঘুরে বেড়ানো এবং নতুন নতুন খাবার খেতে পছন্দ করি।
আমার সম্পূর্ণ প্রোফাইল দেখুন
Creative Commons License

আর্কাইভ

শিশুদের বইয়ের ওয়েব সাইট

বইয়ের খোঁজ